আজকের তারিখঃ 28 অক্টোবর, 2026 সময়ঃ 2:21
লগইন
9+
অনলাইন সংস্করণ 4 মিনিটে পড়ুন ARTICLE

নিখোঁজের একদিন পর টিলার নির্জন স্থান থেকে ১৩ বছরের কিশোরের মরদেহ উদ্ধার,

Front line Bangladesh 19 Sep, 2026 • 02:50 PM
ছবির ক্যাপশন: নিখোঁজের একদিন পর টিলার নির্জন স্থান থেকে ১৩ বছরের কিশোরের মরদেহ উদ্ধার,

মো. শাহজাহান বাশার: 

মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল ১৩ বছরের কিশোর অপ্রতীম। স্বাভাবিক নিয়মেই হয়তো কিছুক্ষণ পর হাসিমুখে বাড়ি ফেরার কথা ছিল তার। কিন্তু সেই বেরিয়ে যাওয়া যে একটি পরিবারের জীবনে চিরস্থায়ী শোকের কারণ হয়ে দাঁড়াবে, তা কেউ ভাবেনি। শুক্রবার বিকেলে বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ অপ্রতীম আর জীবিত অবস্থায় বাড়ি ফিরতে পারেনি। একদিন পর শনিবার কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কের পেছনের একটি টিলা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

নিহত অপ্রতীম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান। সে কুমিল্লা বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয় অপ্রতীম। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সে বাড়িতে ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। স্বজনরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

ছেলেকে খুঁজে পেতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হৃদয়স্পর্শী আকুতি জানান অপ্রতীমের মা ড. নাহিদা বেগম। ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমার ছেলেকে আমি বিকেল ৩টা থেকে খুঁজে পাচ্ছি না। ওর নাম অপ্রতীম। বয়স ১৩, ক্লাস সেভেনে পড়ে। হারানোর সময় ছবিতে দেওয়া পাঞ্জাবিটি তার পরনে ছিল। আমার আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। আপনারা যে যেখান থেকে পারেন সহায়তা করেন। আপনাদের কাছে হাত জোড় করছি আমার ছেলেকে বাঁচান। থানায় জানিয়েছি।’

তিনি আরও জানান, অপ্রতীমের ব্যবহৃত নম্বর ট্র্যাক করেও তার অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ফোনটিও সম্ভবত তার কাছে ছিল না। এদিকে যে ফোনে তার ফেসবুক আইডি লগইন করা ছিল, সেটিও বাসায় রেখে গিয়েছিল বলে জানান তার মা।

অপ্রতীমকে উদ্ধারে পুলিশ ও স্বজনরা বিভিন্নভাবে খোঁজ শুরু করেন। এ সময় বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজও পর্যালোচনা করা হয়। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অপ্রতীমকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে একটি অটোরিকশা থেকে নামতে এবং পরে এক কিশোরের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে বেশ কিছু সময় কথোপকথনের দৃশ্যও সিসিটিভিতে ধরা পড়ে বলে জানা গেছে। ওই কিশোরের পরিচয় ও অপ্রতীমের সঙ্গে তার কী সম্পর্ক ছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি তদন্তের আওতায় রয়েছে।

এর মধ্যেই শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কের পেছনের একটি টিলার নির্জন স্থান থেকে অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিখোঁজ হওয়ার মাত্র একদিনের মাথায় প্রিয় সন্তানের মরদেহ উদ্ধারের সংবাদে ভেঙে পড়েন তার মা-বাবা ও স্বজনরা।

যে মা আগের দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাতজোড় করে সবাইকে বলেছিলেন, ‘আমার ছেলেকে বাঁচান’, পরদিন সেই মাকেই সন্তানের নিথর দেহের খবর শুনতে হলো। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও তার পরিবারের সদস্যরা এখন শোকে পাথর হয়ে গেছেন। স্বজনদের আহাজারি আর সহপাঠীদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

অপ্রতীমের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের নয়, পুরো কুমিল্লার মানুষের হৃদয়ে নাড়া দিয়েছে। মাত্র ১৩ বছরের একটি শিশুর স্বাভাবিকভাবে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হওয়া, এরপর নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এবং একদিন পর নির্জন স্থান থেকে তার মরদেহ উদ্ধার—ঘটনাটি ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

অপ্রতীম কীভাবে ওই টিলায় পৌঁছাল, সেখানে তার সঙ্গে কী ঘটেছিল, তার সঙ্গে থাকা ফোন কোথায় গেল, সিসিটিভিতে দেখা কিশোরটি কে, নিখোঁজ হওয়ার পর তার গতিপথ কী ছিল এবং কীভাবে তার মৃত্যু হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন খুঁজছে পরিবার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

মরদেহ উদ্ধারের পর তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত শুরু হয়েছে। মৃত্যুর পেছনে কারও সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না কিংবা এটি কীভাবে ঘটেছে—তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তবে অপ্রতীমের পরিবারের পাশাপাশি কুমিল্লাবাসীরও প্রত্যাশা, ঘটনাটির প্রতিটি তথ্য ও আলামত গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করে দ্রুত প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা হবে এবং দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হবে।

শুক্রবার বিকেলে যে কিশোরটি মায়ের আইফোন হাতে নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল, শনিবার সে ফিরল নিথর দেহে। একটি মায়ের বুক খালি করে, একটি পরিবারের স্বপ্ন থামিয়ে, মাত্র ১৩ বছর বয়সেই থেমে গেল অপ্রতীমের জীবন।

এখন আর মায়ের অপেক্ষা নেই—নেই দরজায় দাঁড়িয়ে সন্তানের ফিরে আসার আশাও। আছে শুধু শোক, কান্না আর একটি প্রশ্ন—অপ্রতীমের শেষ মুহূর্তে আসলে কী ঘটেছিল?

এই প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে জরুরি।

ট্যাগ
নিখোঁজের একদিন পর টিলার নির্জন স্থান থেকে ১৩ বছরের কিশোরের মরদেহ উদ্ধার
মন্তব্য করুন
Front line Bangladesh
অনলাইন সংস্করণ • 19 Sep, 2026 • 02:50 PM
বিজ্ঞাপন (Compact)