মাসুদ রানা,বিশেষ প্রতিবেদনঃ গত ২৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে রাজধানীর চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংকের ইসলামিক ব্যাংকিং শাখা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আইজিপি, বাংলাদেশ জনাব মোঃ আলী হোসেন ফকিরের বক্তব্যে 'ক্রসফায়ার' শব্দের ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এ বিষয়ে বক্তব্যের প্রকৃত প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন নিম্নোক্ত বক্তব্য প্রদান করছে।
বাংলাদেশ পুলিশ জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধ দমন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করে। এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের প্রায়ই সন্ত্রাসী ও সংঘবদ্ধ অপরাধীদের হামলার মুখোমুখি হতে হয়। ২০২৬ সালের প্রথম ১০ মাসে পুলিশের ওপর ১৭৬টি হামলার ঘটনায় চারজন পুলিশ সদস্য নিহত এবং ৩৭০ জন আহত হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনা দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের ঝুঁকি ও প্রতিকূলতার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
যেমন গত ২৪ অক্টোবর গোপালগঞ্জের বেদগ্রাম খেয়াঘাট এলাকায় একটি মিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে তিনজন পুলিশ সদস্য আহত হন। অন্যদিকে, গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১০টার দিকে টঙ্গী রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় পুলিশের ওপর পাথর নিক্ষেপ করে হাতকড়াসহ এক আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় একজন পুলিশ সদস্য আহত হন। এসব পরিস্থিতিতে পুলিশ সদস্যদের জীবন রক্ষা এবং সরকারি সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা সহজেই অনুধাবন করা যায়।
উল্লেখিত ঘটনাগুলোতে পুলিশ সদস্যরা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার না করে সংযমের পরিচয় দিয়েছেন। দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যরা বারবার হামলার শিকার হলে তাঁদের নিরাপত্তা ও মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে পুলিশের আত্মরক্ষার অধিকার এবং অপরাধ দমনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে আত্মরক্ষার অধিকার স্বীকৃত। দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৯৬ থেকে ১০৬ ধারায়, ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১২৭ ও ১২৮ ধারায় এবং পুলিশ প্রবিধানেও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে প্রাসঙ্গিক নির্দেশনা রয়েছে।
আইজিপি মহোদয়ের বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য ছিল অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পুলিশের আত্মরক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও সক্ষমতার বিষয়টি তুলে ধরা। বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তিনি অপরাধ দমনে পুলিশের দৃঢ় অবস্থান বোঝাতে 'ক্রসফায়ার' শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তাঁর বক্তব্যকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘোষণা বা আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে কাউকে শাস্তি দেওয়ার বক্তব্য হিসেবে ব্যাখ্যা না করে সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
একই অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বিষয়ে আইজিপি মহোদয়ের মন্তব্য নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট যাচাই করে সংবাদ প্রকাশ করার জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। কোনো মন্তব্যের বিচ্ছিন্ন অংশের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছালে প্রকৃত বক্তব্য সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।
পুলিশ ও গণমাধ্যম উভয়ই জনস্বার্থে কাজ করে। পুলিশ অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করে, আর গণমাধ্যম জনগণের কাছে তথ্য পৌঁছে দেয়। তাই একে অপরের পেশাগত দায়িত্ব ও বাস্তবতা বোঝা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন বিশ্বাস করে, পুলিশের আত্মরক্ষার অধিকার ও দায়িত্ব পালনের ঝুঁকি যেমন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন, তেমনি আইনের শাসন, মানবাধিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও অপরিহার্য।
আমরা সকল গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, আইজিপি মহোদয়ের বক্তব্যের প্রকৃত প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সংবাদ প্রকাশ করুন। পুলিশ ও গণমাধ্যমের পারস্পরিক সহযোগিতা জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।