আজকের তারিখঃ 29 অক্টোবর, 2026 সময়ঃ 9:59
লগইন
9+
অনলাইন সংস্করণ 4 মিনিটে পড়ুন ARTICLE

শুধু টিকাদানে হাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, দরকার দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসা

Front line Bangladesh 05 Sep, 2026 • 12:18 PM
ছবির ক্যাপশন: শুধু টিকাদানে হাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, দরকার দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসা

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে চলমান হামের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শুধু টিকাদান কর্মসূচি যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ। তার মতে, টিকাদানের পাশাপাশি দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

হাম পরিস্থিতি নিয়ে দৈনিক কালবেলার এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১৫ মার্চ থেকে ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে হাম উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৮৭ জনে। এর মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু ৯৯ এবং সন্দেহজনিত মৃত্যু ৮৮৮। একই সময়ে সন্দেহজনক রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ লাখ ৬২ হাজার ২৬২ জন। পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১৯ হাজার ৫৬৭ জনের।

এ ছাড়া এ সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার ৪৫৩ জন। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৫০ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, জুন ও জুলাইয়ে সংক্রমণ কিছুটা কমলেও আগস্টে আবারও বেড়েছে হামের প্রাদুর্ভাব। জুলাইয়ে সন্দেহজনক ও নিশ্চিত রোগী মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩১ হাজার ৩২৭ জন। আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ হাজার ৯৩৪ জনে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও ২৬ হাজার ৩৬০ থেকে বেড়ে আগস্টে হয়েছে ২৭ হাজার ৪৫৮ জন।

মৃত্যুর সংখ্যাতেও উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে। জুলাইয়ে ১১৯ জনের মৃত্যুর বিপরীতে আগস্টে মারা গেছে ১৩৬ জন। সেপ্টেম্বরের শুরুতেও সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। শুক্রবার নতুন করে ১ হাজার ১১৪ শিশু হামজনিত সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে এসেছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একবারের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে হামের প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি শক্তিশালী করার পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো এবং অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন।

অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, প্রথমে দেশের প্রকৃত শিশু জনসংখ্যার নির্ভুল তালিকা তৈরি করতে হবে। এরপর টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে শনাক্ত করে টিকা দিতে হবে। ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের জন্য পরিবার ও হাসপাতালভিত্তিক সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করার কথাও বলেন তিনি।

তার মতে, মাস্ক ব্যবহার, নিয়মিত হাত ধোয়া, আক্রান্ত শিশুকে দ্রুত আলাদা রাখা, হাসপাতালের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত পরীক্ষা এবং শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও আইসিইউ সুবিধা নিশ্চিত করাও জরুরি।

হামে পরিস্থিতি অবনতির কারণ খুঁজতে রাজনৈতিক দোষারোপের বাইরে গিয়ে স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। টিকার ঘাটতি কখন তৈরি হয়েছিল, সময়মতো টিকা কেন আসেনি, প্রকৃত টিকা কভারেজ কত এবং হামজনিত শিশুমৃত্যুর ক্ষেত্রে চিকিৎসাব্যবস্থার কোথায় ঘাটতি ছিল—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে সামনে আনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, দেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে শুধু টিকাদানের ঘাটতি নয়, দীর্ঘদিনের ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ও বড় কারণ। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে কোনো শিশু বাদ পড়লে কয়েক বছর পর টিকাবঞ্চিত শিশুদের একটি বড় জনগোষ্ঠী তৈরি হয়, যা হামের বিস্তারের ঝুঁকি বাড়ায়।

তিনি বলেন, জরুরি টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম শক্তিশালী করতে হবে। কত শিশু টিকার বাইরে রয়েছে, তা নির্ভুলভাবে শনাক্ত করে তাদের টিকার আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি টিকার সরবরাহে কোনো ঘাটতি রাখা যাবে না।

ডা. মুশতাক হোসেন আরও বলেন, হামে মৃত্যুর ক্ষেত্রে অপুষ্টি, নিউমোনিয়া ও অন্যান্য জটিলতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই টিকার পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্তকরণ, যথাযথ চিকিৎসা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে হামজনিত শিশুমৃত্যুর কারণ জানতে ডেথ রিভিউ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা দরকার।

একসময় হাম নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হলেও চলতি বছরের পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি দ্রুত রোগ শনাক্ত, চিকিৎসা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে আগামী কয়েক মাসেও হামের প্রাদুর্ভাব অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

ট্যাগ
শুধু টিকাদানে হাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় দরকার দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসা
মন্তব্য করুন
Front line Bangladesh
অনলাইন সংস্করণ • 05 Sep, 2026 • 12:18 PM
বিজ্ঞাপন (Compact)