ইসলাম বিবাহকে একটি পবিত্র ও দায়িত্বশীল বন্ধন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভালোবাসা, পারস্পরিক সম্মান, দায়িত্ব ও শান্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়াই ইসলামের শিক্ষা। একইভাবে তালাকের ক্ষেত্রেও ইসলাম এমন বিধান দিয়েছে, যাতে আবেগের বশবর্তী হয়ে দাম্পত্য সম্পর্ককে খেলায় পরিণত করা না হয়।
তবে তিন তালাকের বিধানকে কেন্দ্র করে সমাজে ‘হিল্লা বিয়ে’ নামে যে ধারণা প্রচলিত রয়েছে, তার সঙ্গে ইসলামের প্রকৃত বিধানের পার্থক্য বোঝা জরুরি।
হিল্লা বিয়ে বলতে কী বোঝায়?
ফিকহের পরিভাষায় ‘তাহলীল’ বলতে এমন বিবাহকে বোঝানো হয়, যার উদ্দেশ্য হলো তিন তালাকপ্রাপ্তা নারীকে পূর্বের স্বামীর জন্য পুনরায় বৈধ করে দেওয়া। অর্থাৎ কোনো নারীকে তিন তালাক দেওয়ার পর পরিকল্পিতভাবে অন্য একজন পুরুষের সঙ্গে এ উদ্দেশ্যে বিয়ে দেওয়া যে, তিনি পরে তাকে তালাক দেবেন এবং এরপর ওই নারী প্রথম স্বামীর কাছে ফিরে যাবেন—এটিই প্রচলিত অর্থে পরিকল্পিত ‘হিল্লা বিয়ে’।
অন্যদিকে, তিন তালাকের পর কোনো নারী অন্য একজন পুরুষকে স্বাভাবিকভাবে বিয়ে করলেন, প্রকৃত দাম্পত্য জীবন যাপন করলেন এবং পরবর্তীতে কোনো স্বাভাবিক কারণে সেই বিবাহ বিচ্ছিন্ন হলো—এটিকে পরিকল্পিত হিল্লা বলা যাবে না।
কোরআনে কি হিল্লা বিয়ের নির্দেশ রয়েছে?
সুরা বাকারার ২৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন—
“অতঃপর সে যদি তাকে (তৃতীয়বার) তালাক দেয়, তবে সে তার জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য একজন স্বামীকে বিবাহ করে। এরপর সেই স্বামী যদি তাকে তালাক দেয়, তাহলে তারা উভয়ে যদি মনে করে যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে, তবে তাদের পুনরায় একত্রিত হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো গুনাহ নেই।”
আয়াতটি তিন তালাকের পর প্রথম স্বামীর সঙ্গে পুনরায় বিবাহের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তের কথা জানায়। কিন্তু কোথাও কোনো নারীকে প্রথম স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে দ্বিতীয় বিয়ে করানোর নির্দেশ দেওয়া হয়নি।
অর্থাৎ দ্বিতীয় বিবাহ হতে হবে প্রকৃত বিবাহ, যার উদ্দেশ্য স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন প্রতিষ্ঠা করা।
পরিকল্পিত হিল্লা সম্পর্কে হাদিসের বক্তব্য
পরিকল্পিত তাহলীলের ব্যাপারে হাদিসে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) হিল্লাকারী এবং যার জন্য হিল্লা করা হয়—উভয়ের ব্যাপারে নিন্দা করেছেন। এ বিষয়ে সুনান আবু দাউদ (হাদিস: ২০৭৬) ও জামে তিরমিজি (হাদিস: ১১২০)-তে বর্ণনা রয়েছে।
এখানে ‘মুহাল্লিল’ বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝানো হয়, যিনি প্রথম স্বামীর জন্য নারীকে বৈধ করার উদ্দেশ্যে তাকে বিয়ে করেন। আর ‘মুহাল্লাল লাহু’ হলো সেই প্রথম স্বামী, যার কাছে নারীকে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই ব্যবস্থা করা হয়।
এক রাত বা এক দিনের ‘হিল্লা’ কি বৈধ?
সমাজে কখনো কখনো এমন ধারণা দেখা যায় যে, তিন তালাকের পর নারীকে এক দিন বা কয়েক দিনের জন্য অন্য পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দিলেই হিল্লা সম্পন্ন হয়ে যাবে। এ ধারণা ইসলামের স্বাভাবিক বিবাহব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
‘এক দিনের হিল্লা’, ‘এক রাতের হিল্লা’ বা আগে থেকেই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সাজানো বিবাহ ইসলামের উদ্দেশ্য নয়।
হজরত আয়িশা (রা.)-এর বর্ণিত হাদিসে দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে প্রকৃত দাম্পত্য সম্পর্কের বিষয়টি স্পষ্টভাবে এসেছে। শুধু বিবাহের আকদ সম্পন্ন করলেই প্রথম স্বামীর জন্য নারী পুনরায় বৈধ হয়ে যান না।
দ্বিতীয় স্বামী কি অবশ্যই তালাক দেবেন?
না। এটি হিল্লা সম্পর্কে প্রচলিত আরেকটি ভুল ধারণা।
দ্বিতীয় বিবাহ যদি স্বাভাবিকভাবে সংঘটিত হয় এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রকৃত দাম্পত্য সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে তাদের সংসার চলতে পারে। দ্বিতীয় স্বামীর ওপর স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার কোনো শরয়ি বাধ্যবাধকতা নেই।
পরবর্তীতে সেই বিবাহ কোনো স্বাভাবিক কারণে বিচ্ছিন্ন হলে এবং ইদ্দত শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি শরিয়তের শর্ত পূরণ করলে প্রথম স্বামীর সঙ্গে নতুন করে বিবাহের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু প্রথম স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য যদি দ্বিতীয় বিবাহের শুরু থেকেই নির্ধারিত থাকে, তাহলে সেটিই পরিকল্পিত তাহলীলের বিষয়।
কেন পরিকল্পিত হিল্লা নিন্দনীয়?
ইসলামে বিবাহ কোনো সাময়িক চুক্তি নয়। এর উদ্দেশ্য হলো প্রশান্তি, ভালোবাসা, দায়িত্ব ও পরিবার গঠন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, তাঁর নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে—তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো এবং তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেন। (সুরা রূম, আয়াত: ২১)
তাই অর্থের বিনিময়ে, সামাজিক চাপের কারণে অথবা পূর্বপরিকল্পিত চুক্তির মাধ্যমে কোনো নারীকে সাময়িকভাবে অন্য পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে আবার প্রথম স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা ইসলামের বিবাহের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি সতর্কতা
কোনো বাস্তব ঘটনায় তিন তালাক কার্যকর হয়েছে কি না, তা শুধু প্রচলিত ধারণার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা উচিত নয়। কী শব্দে তালাক দেওয়া হয়েছে, কখন দেওয়া হয়েছে, এর আগে কোনো তালাক হয়েছিল কি না, একসঙ্গে তালাক উচ্চারণ করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ের ওপর ফিকহি হুকুম ভিন্ন হতে পারে।
তাই বাস্তব কোনো দাম্পত্য সমস্যায় ‘হিল্লা করিয়ে নিন’—এ ধরনের লোকমুখের পরামর্শ অনুসরণ না করে পুরো ঘটনা একজন নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতির কাছে তুলে ধরে শরয়ি পরামর্শ নেওয়া উচিত।
তিন তালাকের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। তাই তালাকের আগে পারিবারিক আলোচনা, মীমাংসা ও সংশোধনের বৈধ পথগুলো অনুসরণ করা জরুরি।
সারকথা: ইসলাম পরিকল্পিত ‘হিল্লা বিয়ে’কে কোনো উৎসাহিত বা অনুসরণীয় প্রথা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেনি। কোরআনের সুরা বাকারার ২৩০ নম্বর আয়াত তিন তালাকের পরিণতি নির্ধারণ করেছে; আর পরিকল্পিতভাবে প্রথম স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে দ্বিতীয় বিবাহকে ইসলামের স্বাভাবিক বিবাহব্যবস্থার সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়। তবে স্বাভাবিকভাবে সংঘটিত দ্বিতীয় বিবাহকে পরিকল্পিত হিল্লার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলাও সমানভাবে ভুল।