আজকের তারিখঃ 27 অক্টোবর, 2026 সময়ঃ 4:49
লগইন
9+
অনলাইন সংস্করণ 3 মিনিটে পড়ুন ARTICLE

হিলফুল ফুজুল: মজলুমের পাশে দাঁড়ানোর ঐতিহাসিক অঙ্গীকার

Front line Bangladesh 03 Sep, 2026 • 04:30 PM
ছবির ক্যাপশন: হিলফুল ফুজুল: মজলুমের পাশে দাঁড়ানোর ঐতিহাসিক অঙ্গীকার

খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগ। চার বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী ‘হারবুল ফিজার’ যুদ্ধের পর মক্কার সমাজ এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হয়। সে সময় মক্কায় ছিল না কোনো কেন্দ্রীয় সরকার, লিখিত আইন কিংবা স্থায়ী বিচারব্যবস্থা। গোত্রপ্রধানদের অনানুষ্ঠানিক পরিষদ ‘আল-মালা’ এবং গোত্রীয় পক্ষপাতিত্ব বা ‘আসাবিয়্যাহ’-এর ওপরই অনেকটা নির্ভর করত সামাজিক ব্যবস্থা।

ফলে কোনো দুর্বল ব্যক্তি কিংবা বহিরাগত কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রতিকার পাওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ ছিল খুবই সীমিত। এই বাস্তবতায় অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়।

ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, প্রায় ৫৯০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কার কয়েকটি গোত্রের উদ্যোগে গড়ে ওঠে ‘হিলফুল ফুজুল’—ন্যায়, অধিকার ও সদাচারের পক্ষে একটি ঐতিহাসিক অঙ্গীকার।

তখন তরুণ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এ অঙ্গীকারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী জীবনে তিনি এই চুক্তির প্রশংসা করেন এবং এর ন্যায়ভিত্তিক উদ্দেশ্যকে ইতিবাচকভাবে স্মরণ করেন।

প্রতারণার শিকার এক বণিক

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হওয়ায় মক্কায় বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা আসতেন। তবে গোত্রীয় প্রভাব ও ক্ষমতার কারণে বহিরাগত কোনো ব্যবসায়ী প্রতারণার শিকার হলে তার ন্যায়বিচার পাওয়া সবসময় সহজ ছিল না।

ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে, ইয়েমেনের জুবাইদ গোত্রের এক বণিক মক্কায় পণ্য বিক্রি করেন কোরাইশের বনু সাহম গোত্রের নেতা আস ইবনে ওয়ায়েল আস-সাহমির কাছে। পণ্য গ্রহণের পর তিনি এর মূল্য পরিশোধ করতে অস্বীকৃতি জানান বলে বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।

বণিক ন্যায়বিচারের আশায় মক্কার বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে অভিযোগ করেন। কিন্তু আস ইবনে ওয়ায়েলের গোত্রীয় প্রভাবের কারণে অনেকেই তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহস পাচ্ছিলেন না।

পরিস্থিতিতে বিষয়টি মক্কার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নজরে আসে। বনু হাশিমের প্রধান জুবাইর ইবনে আবদুল মুত্তালিব এ ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।

আবু কোবাইস পাহাড় থেকে প্রতিবাদ

ন্যায়বিচারের প্রচলিত পথগুলো যখন কার্যত বন্ধ হয়ে যায়, তখন সেই বণিক প্রকাশ্য প্রতিবাদের পথ বেছে নেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়।

তিনি মক্কার আবু কোবাইস পাহাড়ে উঠে কোরাইশ নেতাদের উদ্দেশে নিজের ওপর হওয়া অন্যায়ের কথা তুলে ধরেন। সেই সময় কাবা প্রাঙ্গণে মক্কার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা সমবেত ছিলেন বলে বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।

তিনি উচ্চকণ্ঠে নিজের দুর্দশার কথা জানিয়ে ন্যায়বিচারের আহ্বান জানান। তাঁর এই প্রকাশ্য প্রতিবাদ মক্কার সমাজের বিবেককে নাড়া দেয় এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এরপরই কয়েকটি গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা একত্রিত হয়ে একটি অঙ্গীকারে আবদ্ধ হন—মক্কায় কোনো ব্যক্তি, বিশেষ করে দুর্বল বা বহিরাগত কেউ অন্যায়ের শিকার হলে তার পক্ষে সম্মিলিতভাবে দাঁড়ানো হবে এবং তার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

এই অঙ্গীকারই ইতিহাসে ‘হিলফুল ফুজুল’ নামে পরিচিত।

হিলফুল ফুজুলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল—ন্যায়বিচারের প্রশ্নে গোত্র, পরিচয় কিংবা ক্ষমতার ঊর্ধ্বে উঠে মজলুমের পাশে দাঁড়ানো। ইসলামের আবির্ভাবের আগের আরব সমাজে এমন একটি ন্যায়ভিত্তিক সামাজিক উদ্যোগ ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

পরবর্তী জীবনে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করে এর প্রশংসা করেন বলে ইসলামী ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। এতে বোঝা যায়, ন্যায় ও অধিকার প্রতিষ্ঠার যে মূল্যবোধ তাঁর নবুয়তি জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে উঠেছিল, তার সঙ্গে হিলফুল ফুজুলের ন্যায়ভিত্তিক চেতনার একটি ঐতিহাসিক যোগসূত্র ছিল।

ট্যাগ
হিলফুল ফুজুল: মজলুমের পাশে দাঁড়ানোর ঐতিহাসিক অঙ্গীকার
মন্তব্য করুন
Front line Bangladesh
অনলাইন সংস্করণ • 03 Sep, 2026 • 04:30 PM
বিজ্ঞাপন (Compact)