শিশুরা আমাদের জন্য আল্লাহর দেওয়া আমানত। তাদের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। মা-বাবা, শিক্ষক ও সমাজের সদস্য হিসেবে শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা সবার দায়িত্ব। শিশুদের যত্ন, মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে আচরণ করতে হবে এবং এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে কোনো কিছু তাদের অস্বস্তিতে ফেললে তারা নির্ভয়ে তা জানাতে পারে।
এ ক্ষেত্রে প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ আমাদের জন্য অনুসরণীয়। শিশুদের কীভাবে ভালোবাসা, যত্ন ও সঠিকভাবে লালন-পালন করতে হয়, তার জীবনে রয়েছে চিরন্তন পথনির্দেশনা।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনদের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ঈমানের অধিকারী সে-ই, যে চরিত্রে উত্তম এবং পরিবারের সদস্যদের প্রতি সবচেয়ে বেশি কোমল ও সদয়।’ (তিরমিজি)
১. শিশুদের প্রতি ভালোবাসা ও মনোযোগ
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) শিশুদের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও দয়া প্রদর্শন করতেন। শুধু নিজের পরিবারের শিশুদের প্রতিই নয়, আশপাশের অন্য শিশুদের প্রতিও তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল-আকরাআ ইবনে হাবিস মহানবী (সা.)-কে তাঁর নাতি হাসানকে চুমু দিতে দেখেন। তখন তিনি বলেন, ‘আমার ১০টি সন্তান রয়েছে, কিন্তু আমি তাদের কাউকেই কখনো চুমু দিইনি।’ জবাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হবে না।’ (সহিহ মুসলিম)
শিশুদের প্রতি মহানবী (সা.)-এর যত্নের আরেকটি দিক ছিল তাদের অনুভূতি ও ছোট ছোট বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া। আবু উমাইর নামে এক ছোট ছেলে তার পোষা পাখির মৃত্যুতে মন খারাপ করেছিল। মহানবী (সা.) বিষয়টি লক্ষ্য করে স্নেহের সঙ্গে তার সঙ্গে কথা বলেন।
এ থেকে মা-বাবার জন্যও শিক্ষা রয়েছে। সন্তানদের বয়স অনুযায়ী দায়িত্ব দেওয়া, পারিবারিক আলোচনা ও সিদ্ধান্তে তাদের মতামত শোনা এবং বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া উচিত। এতে শিশুরা নিজেদের মূল্যবান মনে করে এবং তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠে।
২. শিশুদের অনুভূতি ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া
শিশুর কাছে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, বড়দের কাছে তা ছোট মনে হলেও সেটিকে অবহেলা করা উচিত নয়। মহানবী (সা.) শিশুদের অনুভূতি ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতেন।
সন্তানের মন খারাপ, ভয়, আনন্দ কিংবা কোনো বিশেষ আগ্রহ—এসব বিষয়ে মনোযোগী হওয়া মা-বাবার দায়িত্ব। শিশুর কথা মন দিয়ে শোনা এবং তাকে নিজের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ দেওয়া তার আত্মবিশ্বাস ও নিরাপত্তাবোধ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
৩. শিশুদের সঙ্গে কোমল ও স্নেহশীল আচরণ
মহানবী (সা.) শিশুদের সঙ্গে কোমল ও স্নেহপূর্ণ আচরণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। শাসন বা সংশোধনের ক্ষেত্রেও শিশুর মর্যাদা ও মানসিক অবস্থার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
শিশুকে ভয় দেখানো, অপমান করা কিংবা অন্যদের সামনে বিব্রত করার পরিবর্তে ভালোবাসা ও বোঝানোর মাধ্যমে সঠিক পথে পরিচালিত করাই উত্তম। নিরাপদ ও স্নেহপূর্ণ পরিবেশ শিশুর সুস্থ মানসিক ও নৈতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৪. কন্যা ফাতিমা (রা.)-এর প্রতি গভীর সম্মান
মহানবী (সা.)-এর কন্যা ফাতিমা (রা.) তাঁর কাছে এলে তিনি তাকে স্বাগত জানাতে দাঁড়িয়ে যেতেন। এরপর তার হাত ধরে চুমু দিতেন এবং নিজের বসার জায়গায় তাকে বসাতেন। একইভাবে মহানবী (সা.) যখন ফাতিমা (রা.)-এর কাছে যেতেন, তিনিও উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর হাত ধরে চুমু দিতেন এবং নিজের জায়গায় বসাতেন।
এই আচরণগুলো বাবা-মেয়ের গভীর ভালোবাসা ও পারস্পরিক সম্মানের প্রকাশ।
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) বলেন, আচরণ, চালচলন ও স্বভাবের দিক থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে ফাতিমার চেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ আর কাউকে তিনি দেখেননি। মহানবী (সা.) ফাতিমাকে আসতে দেখলে তার জন্য দাঁড়িয়ে যেতেন, তার হাত ধরতেন, তাকে চুমু দিতেন এবং নিজের জায়গায় বসাতেন। (তিরমিজি)
মহানবী (সা.)-এর এই দৃষ্টান্ত আমাদের শেখায়, সন্তানদেরও মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে আচরণ করা উচিত। মা-বাবার উচিত সন্তানের ব্যক্তিগত বিষয় ও গোপনীয়তার প্রতি সম্মান দেখানো এবং অন্যদের সামনে তাকে বিব্রত বা অপমান না করা।
৫. সন্তানদের সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ
মা-বাবা কখনো জেনে বা না জেনে এক সন্তানের প্রতি অন্য সন্তানের চেয়ে বেশি পক্ষপাত দেখাতে পারেন। মহানবী (সা.) সন্তানদের মধ্যে ন্যায়সংগত আচরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
নুমান (রা.) থেকে বর্ণিত, তাঁর বাবা তাকে একটি উপহার দেওয়ার পর বিষয়টি মহানবী (সা.)-এর কাছে নিয়ে যান এবং এ বিষয়ে তাঁকে সাক্ষী রাখতে চান। তখন মহানবী (সা.) জিজ্ঞেস করেন, তিনি কি তাঁর সব সন্তানকে একই ধরনের উপহার দিয়েছেন? তিনি না বললে মহানবী (সা.) বলেন, ‘তাহলে আমি কোনো বিষয়ের ওপর সাক্ষী হব না।’ (সুনানে নাসায়ি)
এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, সন্তানদের মধ্যে ভালোবাসা, প্রশংসা ও উপহারের ক্ষেত্রে অযথা বৈষম্য করা উচিত নয়। এক সন্তানের প্রতি অতিরিক্ত পক্ষপাত অন্য সন্তানদের আত্মমর্যাদা ও পারিবারিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
শিশু লালন-পালনে নবীজির আদর্শ
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর জীবন ও কর্মের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, শিশুদের ভালোবাসা, যত্ন, ধৈর্য ও সম্মানের সঙ্গে কীভাবে লালন-পালন করতে হয়। তাঁর আদর্শ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিশুদের যত্ন শুধু তাদের খাওয়ানো, পড়াশোনা করানো বা দিকনির্দেশনা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাদের নিরাপদ, মূল্যবান ও সুরক্ষিত বোধ করানোও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মা-বাবা ও সমাজের সদস্য হিসেবে এসব শিক্ষা দৈনন্দিন জীবনে বাস্তবায়ন করা আমাদের দায়িত্ব। আল্লাহ আমাদের এমন সন্তান লালন-পালনের তাওফিক দিন, যারা তাঁর প্রতি অনুগত হবে, উত্তম চরিত্র নিয়ে বেড়ে উঠবে এবং ভবিষ্যতে নিজেদের পরিবার ও সমাজের জন্য কল্যাণের উৎস হয়ে উঠবে। আমিন।