পৃথিবীতে সবচেয়ে মধুর শব্দগুলোর একটি ‘মা’। যে ভাষাতেই উচ্চারণ করা হোক না কেন, মাকে ডাকার সেই শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ভালোবাসা, মমতা ও নিরাপত্তার অনুভূতি। মহান আল্লাহর দেওয়া শ্রেষ্ঠ নিয়ামতগুলোর অন্যতম মা। সন্তানের জন্য মায়ের ভালোবাসা, ত্যাগ ও মমতার কোনো তুলনা হয় না।
ইসলাম মায়ের মর্যাদাকে অত্যন্ত উঁচুতে স্থান দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা নিজের ইবাদতের নির্দেশের পাশাপাশি মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমার রব আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণ করবে।’ (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত: ২৩)
এই আয়াতে শুধু মা-বাবার সঙ্গে ভালো আচরণের নির্দেশই দেওয়া হয়নি; বরং তাদের বার্ধক্যে পৌঁছালে সামান্য বিরক্তির শব্দ ‘উফ’ বলতেও নিষেধ করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে সম্মানজনক ভাষায় কথা বলার নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ তাআলা।
পবিত্র কোরআনের আরেক আয়াতে বিশেষভাবে মায়ের কষ্ট ও ত্যাগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তার মা কষ্টের পর কষ্ট ভোগ করে তাকে গর্ভে ধারণ করে। আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে।’ (সুরা লুকমান, আয়াত: ১৪)
মায়ের এই ত্যাগের কারণেই ইসলামে তাঁর অধিকারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এক ব্যক্তি জানতে চেয়েছিলেন, উত্তম সঙ্গ ও সদ্ব্যবহারের সবচেয়ে বেশি হকদার কে? নবীজি (সা.) বলেন, ‘তোমার মা।’ লোকটি আবার জিজ্ঞেস করলেন, এরপর কে? তিনি বলেন, ‘তোমার মা।’ তৃতীয়বারও একই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘তোমার মা।’ চতুর্থবার জিজ্ঞেস করলে বলেন, ‘তোমার বাবা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৭১)
হাদিসটি মায়ের মর্যাদা কতটা উচ্চ—তা স্পষ্ট করে। মায়ের খিদমত, সন্তুষ্টি অর্জন ও তাঁর সঙ্গে উত্তম আচরণ একজন মুসলমানের জন্য আল্লাহর নৈকট্য লাভের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
মাতৃসেবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাবেঈ উওয়াইস আল-কারনী (রহ.)-এর জীবনে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে জীবিত থেকেও মায়ের সেবায় নিয়োজিত থাকার কারণে তিনি রাসুলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেননি। তবে তাঁর মাতৃসেবার মর্যাদা এতটাই ছিল যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের তাঁর কাছে দোয়া চাইতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৩৮৫)
মায়ের সেবার প্রতিদান সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, ‘মায়ের পদতলে জান্নাত।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৩১০৪) অর্থাৎ মায়ের সন্তুষ্টি অর্জন ও তাঁর সেবার মাধ্যমে জান্নাত লাভের পথ সুগম হয়।
মায়ের খিদমত শুধু তাঁর প্রয়োজন পূরণ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর সঙ্গে সুন্দরভাবে কথা বলা, সময় দেওয়া, অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো এবং বার্ধক্যে যত্ন নেওয়াও মাতৃসেবার অংশ।
দুঃখজনকভাবে আধুনিক ব্যস্ত জীবনে অনেক বৃদ্ধ মা-বাবা অবহেলার শিকার হন। কখনো কখনো নিজের সন্তানদের কাছ থেকেই তাঁরা একাকিত্ব ও অবহেলার যন্ত্রণা পান। অথচ ইসলাম মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালনে অত্যন্ত কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছে।
মা জীবিত থাকলে তাঁর সর্বোচ্চ সেবা করা সন্তানের দায়িত্ব। আর মা ইন্তেকাল করলে তাঁর জন্য দোয়া করা, সদকা করা এবং নেক আমলের মাধ্যমে সওয়াব পৌঁছানোর চেষ্টা করা উচিত।
তাই মায়ের প্রতি ভালোবাসা শুধু আবেগের বিষয় নয়; এটি একজন মুসলমানের ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব। মায়ের সন্তুষ্টি অর্জন, তাঁর খিদমত এবং সম্মান করার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে জীবিত মায়েদের যথাযথ খিদমত করার এবং প্রয়াত মায়েদের জন্য বেশি বেশি দোয়া করার তাওফিক দান করুন। আমিন।