নিজস্ব প্রতিবেদক
বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের কাছে পবিত্র নগরী মক্কা ও বায়তুল্লাহ বা কাবা শরিফের রয়েছে অনন্য মর্যাদা। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মভূমি হিসেবে মক্কার প্রতি মুসলিমদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা আরও গভীর।
তবে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে পবিত্র এই নগরী ও কাবা শরিফ যুদ্ধ, হামলা, দখল, লুটপাট এবং মহামারির মতো ভয়াবহ ঘটনার সাক্ষী হয়েছে। আবরাহার কাবা আক্রমণের চেষ্টা থেকে শুরু করে কারমাতিদের হাজি হত্যাকাণ্ড এবং ১৯৭৯ সালে মসজিদুল হারাম দখল—মক্কার ইতিহাসে রয়েছে নানা বেদনাদায়ক অধ্যায়।
পৃথিবীর প্রথম মসজিদ মসজিদুল হারাম
মক্কায় অবস্থিত পবিত্র মসজিদুল হারাম পৃথিবীর সর্বপ্রথম নির্মিত মসজিদ হিসেবে ইসলামী ঐতিহ্যে পরিচিত। আবু জর গিফারি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেন, পৃথিবীতে সর্বপ্রথম কোন মসজিদ নির্মিত হয়েছে? তিনি বলেন, ‘মসজিদে হারাম।’ এরপর কোনটি—জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘মসজিদে আকসা।’ (বুখারি)
ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী, হজরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টিরও আগে কাবাঘরের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে হজরত আদম (আ.) এবং মহাপ্লাবনের পর হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তার ছেলে হজরত ইসমাইল (আ.) কাবাঘর পুনর্নির্মাণ করেন বলে ইসলামী ঐতিহ্যে উল্লেখ রয়েছে।
আবরাহার কাবা আক্রমণের চেষ্টা
ইসলামের আগমনের আগেও মক্কার কাবা ছিল তীর্থযাত্রা ও ইবাদতের কেন্দ্র। কাবার মর্যাদা ও জনপ্রিয়তায় ক্ষুব্ধ হয়ে ইয়েমেনের গভর্নর আবরাহা বিন সবাহ খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকে কাবা ধ্বংসের উদ্দেশ্যে বিশাল সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন।
প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, আবরাহা সানায় একটি বিশাল গির্জা নির্মাণ করে সেটিকে তীর্থযাত্রার নতুন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কাবার প্রতি মানুষের আকর্ষণ কমেনি। পরে তিনি হাতিসহ বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কার দিকে অগ্রসর হন।
কাবার কাছাকাছি পৌঁছানোর পর হাতিটি আর সামনে এগোয়নি বলে ইসলামী বর্ণনায় উল্লেখ আছে। শেষ পর্যন্ত আবরাহার বাহিনী ধ্বংস হয়ে যায়। এ ঘটনা ইসলামী ইতিহাসে ‘হাতির বছর’ নামে পরিচিত।
কারমাতিদের হাতে হাজিদের হত্যাকাণ্ড
৯৩০ খ্রিস্টাব্দে শিয়া কারমাতি রাষ্ট্র মক্কায় হামলা চালিয়ে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ঘটায়। ঐতিহাসিকদের বিভিন্ন বর্ণনায় নিহতের সংখ্যা কয়েক হাজার থেকে ৩০ হাজার পর্যন্ত বলা হয়েছে।
কারমাতিদের নেতা আবু তাহির আল-জান্নাবি মক্কায় হামলার সময় হাজিদের হত্যা করেন এবং জমজম কূপে লাশ নিক্ষেপ করা হয় বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। তারা কাবা শরিফের দরজা ও হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথরও নিয়ে যায়।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, হাজরে আসওয়াদ প্রায় দুই দশক কারমাতিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। পরে ৯৫২ সালে বিপুল অর্থের বিনিময়ে তা ফিরিয়ে আনা হয়।
উনিশ শতকে মহামারির প্রাদুর্ভাব
উনিশ শতকে মক্কা ও হিজাজ অঞ্চলে প্লেগ, কলেরা ও মেনিনজাইটিসসহ বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। এসব মহামারির কারণে কয়েক দফা হজ ও ওমরাহ স্থগিত করা হয়।
১৮১৪ সালে হিজাজ অঞ্চলে প্লেগে প্রায় ৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় বলে ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়। ১৮৩৭ সাল থেকে শুরু হওয়া আরেক দফা মহামারি দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে। ১৮৪৬ ও ১৮৬৫ সালে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
রোগের বিস্তার ঠেকাতে হজযাত্রীদের যাত্রাপথে কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৮৩০ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে মক্কায় অন্তত ২৭ বার কলেরা মহামারির প্রাদুর্ভাব দেখা যায়।
১৯৭৯ সালে মসজিদুল হারাম দখল
১৯৭৯ সালের ২০ নভেম্বর ফজরের নামাজের সময় সৌদি আরবের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী মসজিদুল হারাম দখল করে নেয়। জুহাইমান ইবনে মোহাম্মদ আল-ওতাইবির নেতৃত্বে কয়েকশ সশস্ত্র ব্যক্তি এই দখলদারিতে অংশ নেয়।
তারা সৌদি রাজপরিবারের শাসনব্যবস্থার বিরোধিতা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দাবি উত্থাপন করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সৌদি বাহিনী অভিযান চালায়। অবরুদ্ধ পরিস্থিতি প্রায় দুই সপ্তাহ স্থায়ী হয়।
শেষ পর্যন্ত সৌদি বাহিনী মসজিদুল হারামের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করে। সংঘর্ষে সেনা, বিদ্রোহী ও বেসামরিক নাগরিকসহ বহু মানুষ নিহত হন। পরে জুহাইমান ও তার সহযোগীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
২০১৪ সালে ইবোলা আতঙ্ক
২০১৪ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলা ভাইরাসের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে সৌদি আরব গিনি, লাইবেরিয়া ও সিয়েরা লিওনের নাগরিকদের জন্য সাময়িকভাবে হজ ও ওমরাহ ভিসা দেওয়া বন্ধ করে।
রোগটির বিস্তার ঠেকাতে বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দরেও স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। ওই প্রাদুর্ভাবে পশ্চিম আফ্রিকায় ১১ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় বলে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর তথ্য থেকে জানা যায়।
ইতিহাসের এসব ঘটনা দেখায়, পবিত্র মক্কা নগরী ও কাবা শরিফ শুধু ধর্মীয় মর্যাদার প্রতীকই নয়, বরং বহু শতাব্দীর নানা রাজনৈতিক, সামরিক ও সামাজিক পরিবর্তনেরও সাক্ষী।
সূত্র: আল জাজিরা, টিআরটি ওয়ার্ল্ড