বরকত অর্থ কল্যাণ, প্রাচুর্য ও স্থায়িত্ব। জীবনে বরকত মানে শুধু সম্পদ বৃদ্ধি নয়; বরং অল্পে তৃপ্তি, অল্প সময়ে বেশি ভালো কাজ করার তাওফিক, পরিবারে শান্তি, রিজিকে প্রশস্ততা এবং জীবনের প্রতিটি কাজে কল্যাণ লাভ করাও বরকতের অন্তর্ভুক্ত।
কোরআন ও হাদিসে এমন কিছু আমলের কথা এসেছে, যেগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে জীবনে বরকত লাভের কারণ হতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—
১. হারাম থেকে বেঁচে তাকওয়া অবলম্বন করা
জীবনে বরকতের অন্যতম বড় চাবিকাঠি তাকওয়া। হারাম উপার্জন, সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, জুলুমসহ সব ধরনের হারাম কাজ থেকে বেঁচে থাকা জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যদি জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তাহলে আমি তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর বরকতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৯৬)
২. কাজের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা
খাওয়া, ঘরে প্রবেশসহ ভালো কাজের শুরুতে আল্লাহর নাম নেওয়া একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ আদব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তি ঘরে প্রবেশ ও খাবারের সময় আল্লাহকে স্মরণ করলে শয়তান বলে, ‘তোমাদের এখানে রাত কাটানোর স্থানও নেই, খাবারও নেই।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২০১৮)
৩. কোরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা
কোরআন একটি বরকতময় কিতাব। নিয়মিত তিলাওয়াতের পাশাপাশি এর অর্থ বোঝা, চিন্তা করা এবং জীবনকে কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী পরিচালনা করা উচিত। আল্লাহ বলেন, ‘এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি নাজিল করেছি, যাতে তারা এর আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে।’ (সুরা : সাদ, আয়াত : ২৯)
৪. নিয়মিত দান-সাদাকাহ করা
সাদাকাহ সম্পদ কমিয়ে দেয় না; বরং এর মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণ ও বরকতের আশা করা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সাদাকাহ সম্পদ কমায় না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৮)
৫. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা
আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া, তাদের সহযোগিতা করা, ভালোবাসা ও ক্ষমার মাধ্যমে সম্পর্ক বজায় রাখা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক প্রশস্ত করা হোক এবং তার আয়ু বৃদ্ধি করা হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৫৭)
৬. দিনের শুরুটা কাজে লাগানো
ইসলামে দিনের শুরুর সময়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া করেছেন, ‘হে আল্লাহ! আমার উম্মতের দিনের শুরুর সময়ে বরকত দান করুন।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ১২১২)
তাই সম্ভব হলে দিনের শুরুতেই গুরুত্বপূর্ণ ও কল্যাণকর কাজগুলো সম্পন্ন করার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।
৭. নিজের ও পরিবারের সালাতের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া
নিজে নামাজ আদায়ের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও নামাজের প্রতি অভ্যস্ত করা দায়িত্বের অংশ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আপনি আপনার পরিবারকে সালাতের নির্দেশ দিন এবং নিজেও এর ওপর অবিচল থাকুন। আমি আপনার কাছে রিজিক চাই না; আমিই আপনাকে রিজিক দিই।’ (সুরা : ত্ব-হা, আয়াত : ১৩২)
৮. বেশি বেশি ইস্তিগফার করা ও সালামের প্রচার করা
ইস্তিগফার গুনাহ মাফের পাশাপাশি আল্লাহর রহমত ও বিভিন্ন নিয়ামত লাভের মাধ্যম হতে পারে। নুহ (আ.) তাঁর জাতিকে বলেছিলেন, ‘তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল।’ এরপর বৃষ্টি, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি প্রদানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। (সুরা : নুহ, আয়াত : ১০-১২)
অন্যদিকে সালাম মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি বাড়ায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সালামের প্রচলন করো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫৪)
অতএব, জীবনে বরকত পেতে হলে শুধু বেশি সম্পদের পেছনে ছোটা নয়; বরং হালাল পথে চলা, ইবাদত-বন্দেগি, কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক, দান-সাদাকাহ, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা, ইস্তিগফার ও উত্তম আচরণকে জীবনের অংশ করে নেওয়া জরুরি।
আল্লাহ আমাদের রিজিক, সময়, পরিবার, আমল ও সমগ্র জীবনে বরকত দান করুন। আমিন।