আজকের তারিখঃ 27 অক্টোবর, 2026 সময়ঃ 4:47
লগইন
9+
অনলাইন সংস্করণ 6 মিনিটে পড়ুন ARTICLE

কোরআনের সঙ্গে সাহাবিদের ভালোবাসার সম্পর্ক

Front line Bangladesh 28 Aug, 2026 • 01:25 PM
ছবির ক্যাপশন: কোরআনের সঙ্গে সাহাবিদের ভালোবাসার সম্পর্ক

পবিত্র কোরআনের সঙ্গে সাহাবায়ে কেরামের সম্পর্ক কেবল তেলাওয়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত এক গভীর ভালোবাসার সম্পর্ক। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুমহান শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছিল তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। সাহাবিদের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কোরআনের প্রতি তাদের ভালোবাসা কেবল মুখের উচ্চারণে সীমাবদ্ধ কোনো অনুরাগ ছিল না; বরং তা ছিল তাদের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে থাকা গভীর ইশক ও মুহাব্বত।

কোরআনের আয়াত নাজিল হলে তারা পরম ব্যাকুলতা ও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তা গ্রহণ করতেন। আল্লাহর প্রতিটি নির্দেশ নিজেদের জীবনে বাস্তবায়নের জন্য তারা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতেন। কোরআনের প্রতি এই গভীর ভালোবাসার আলোয় সাহাবিদের জীবনে যে অনুপম আত্মিক সৌন্দর্য ফুটে উঠেছিল, তা যুগ যুগ ধরে মুসলিম উম্মাহর জন্য পথপ্রদর্শক ও অনুপ্রেরণার চিরন্তন উৎস হয়ে আছে।

কোরআনের সঙ্গে সাহাবিদের সম্পর্ক কেমন ছিল, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন হজরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)। নিজের খেলাফতকালে তিনি মুসলিম বিশ্বের জন্য কোরআনের পাঠ সংরক্ষণ ও একীভূত মুসহাফ প্রস্তুতের কাজ তদারকি করেছিলেন। জীবনের শেষ মুহূর্তেও তিনি ছিলেন কোরআনমুখী।

শাহাদাতের আগে যখন বিদ্রোহীদের একটি দল মদিনায় তার বাড়ি ঘিরে রেখেছিল, তখনও তিনি ঘরের ভেতরে কোরআন সামনে নিয়ে রোজা অবস্থায় ছিলেন। বিদ্রোহীরা প্রাচীর টপকে ভেতরে প্রবেশ করার সময়ও তিনি তেলাওয়াতে মগ্ন ছিলেন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার সেই কোরআন তেলাওয়াত থামেনি।

হাদিসে কুদসিতে এসেছে, কোরআন পড়ায় ব্যস্ত থাকার কারণে যে বান্দার দোয়া করার সময় হয় না, আল্লাহ তাকে দোয়াকারীর চেয়েও বেশি দান করেন। সাহাবায়ে কেরাম এসব কথা সরাসরি নবীজি (সা.)-এর মুখ থেকে শুনেছিলেন। তাই কোরআন তেলাওয়াত তাদের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল।

তবে কোরআন তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে তাদের আগ্রহের সঙ্গে ভারসাম্যও ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, তিন দিনের কম সময়ে কোরআন খতম করলে তা গভীরভাবে বোঝা সম্ভব হয় না। দ্রুত তেলাওয়াতের কারণে অর্থ ও শিক্ষার প্রতি যথাযথ মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৩৯৪)

এ কারণে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) তার অনুসারীদের সাত দিনে একবার কোরআন খতম করার পরামর্শ দিতেন এবং তিন দিনের কম সময়ে খতম না করার কথা বলতেন। এতে বোঝা যায়, সাহাবিদের কাছে কেবল কতবার খতম করা হলো, সেটিই মুখ্য ছিল না; বরং তেলাওয়াতের গভীরতা, উপলব্ধি ও আমল ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এই ভারসাম্য বজায় রাখতে তারা কোরআনকে সাতটি মঞ্জিলে ভাগ করে তেলাওয়াত করতেন। প্রথম দিনে সুরা ফাতিহা থেকে সুরা নিসা, দ্বিতীয় দিনে সুরা মায়িদা থেকে সুরা তওবা—এভাবে সপ্তম দিনে সুরা কাফ থেকে সুরা নাস পর্যন্ত তেলাওয়াত সম্পন্ন হতো। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৩৯৩)

হজরত ওমর ফারুক (রা.) সম্পর্কে ইবনে আব্বাস (রা.)-এর একটি পর্যবেক্ষণ রয়েছে—তিনি ঘরে প্রবেশ করলেই কোরআন তেলাওয়াতে বসতেন। হজরত আবু বকর (রা.)-এর অভ্যাস ছিল তাহাজ্জুদের নামাজে দীর্ঘ সময় কোরআন তেলাওয়াত করা। অবসর পেলেই তিনি কোরআন নিয়ে বসতেন।

ইফকের ঘটনায় বর্ণিত হয়েছে, হজরত আয়েশা (রা.) উটে চড়ে বাড়িতে ফিরে আসার সময় হজরত আবু বকর (রা.) বৈঠকখানায় বসে কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন। এটি ছিল তার স্বাভাবিক অভ্যাস। (মুসনাদে আহমাদ) হজরত আয়েশা (রা.) নিজেও প্রতিদিন নিজের বিছানায় বসে এক মঞ্জিল কোরআন তেলাওয়াত করতেন।

একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-কে বললেন, ‘আমাকে কোরআন পড়ে শোনাও।’ ইবনে মাসউদ (রা.) বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘আপনার ওপরই তো কোরআন নাজিল হয়েছে, আমি আপনাকে পড়ে শোনাব?’ নবীজি (সা.) বললেন, ‘আমি অন্যের মুখে কোরআন শুনতে ভালোবাসি।’

এরপর ইবনে মাসউদ (রা.) সুরা নিসা তেলাওয়াত শুরু করেন। তিনি যখন ৪১ নম্বর আয়াতে পৌঁছান, যেখানে কেয়ামতের দিন প্রতিটি উম্মতের মধ্য থেকে সাক্ষী উপস্থিত করার কথা বলা হয়েছে, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। তিনি বলেন, ‘যথেষ্ট, থামো।’ (সহিহ বোখারি, হাদিস: ৫০৫০)

কোরআন তেলাওয়াতে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মর্যাদা ছিল অত্যন্ত উঁচু। রাসুলুল্লাহ (সা.) তার তেলাওয়াতের প্রশংসা করেছেন। অন্য এক হাদিসে তিনি চারজন সাহাবির নাম উল্লেখ করে বলেছেন, তাদের কাছ থেকে কোরআন শেখা যেতে পারে। তারা হলেন—আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.), সালিম (আবু হুজাইফা (রা.)-এর আজাদকৃত দাস), মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) এবং উবাই ইবনে কাব (রা.)। (সহিহ বোখারি, হাদিস: ৩৭৫৮)

হজরত ওমর (রা.) নিজেও স্বীকার করেছেন, তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে উবাই ইবনে কাব (রা.) ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ। (সহিহ বোখারি, হাদিস: ৪১২৯) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশাতেই তিনি পুরো কোরআন হিফজ করেছিলেন।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.)-এর একটি ঘটনাও এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) লক্ষ করলেন, এই তরুণ সাহাবি ইবাদতে এতটাই মগ্ন থাকেন যে, সংসার ও অন্যান্য দায়িত্বের জন্য সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ছে। নবীজি (সা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তার নিয়মিত আমল কী।

তিনি বললেন, দিনে রোজা রাখেন এবং রাতে একবার কোরআন খতম করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে আমল কিছুটা কমিয়ে আনার পরামর্শ দেন। তিনি জানান, আরও বেশি করার সামর্থ্য তার রয়েছে। শেষ পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে সাত দিনে একবার কোরআন খতম করার নির্দেশনা দেন। (সহিহ বোখারি, হাদিস: ৫০৫২)

হজরত কায়েস ইবনে আবি সাসাআ (রা.)-এর ঘটনাও একই ধরনের। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কত দিনে কোরআন খতম করা উচিত? নবীজি (সা.) প্রথমে ১৫ দিনের কথা বলেন। তিনি আরও দ্রুত খতম করার সামর্থ্যের কথা জানালে শেষ পর্যন্ত সাত দিনে খতম করার অনুমতি দেওয়া হয়।

বার্ধক্যে যখন সাত দিনে কোরআন খতম করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে, তখন তিনি আবার ১৫ দিনের সময়সূচিতে ফিরে যান। তখন তিনি আফসোস করে বলতেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রথম প্রস্তাবটিই যদি গ্রহণ করতাম! (মুজামুল কাবির, ১৮/৩৪৪-৪৫)

সাহাবায়ে কেরামের জীবনে যুদ্ধ ছিল, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব ছিল, পরিবার ও জীবিকার ব্যস্ততা ছিল। তবু কোরআনের জন্য সময় বের করা ছিল তাদের জীবনযাপনের স্বাভাবিক অংশ। কোরআন ছিল তাদের পথনির্দেশনা, চিন্তার উৎস, হৃদয়ের প্রশান্তি এবং আমলের ভিত্তি।

সাহাবিদের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত কোরআনের সঙ্গে এই গভীর সম্পর্কই বহু প্রজন্মের মানুষকে আল্লাহর কিতাবের কাছে ফিরিয়ে এনেছে। আমাদেরও উচিত কেবল তেলাওয়াতেই সীমাবদ্ধ না থেকে কোরআন বোঝার চেষ্টা করা এবং এর শিক্ষা নিজেদের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে বাস্তবায়ন করা।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত, তা অনুধাবন এবং এর শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: ইমাম ও খতিব

ট্যাগ
কোরআনের সঙ্গে সাহাবিদের ভালোবাসার সম্পর্ক
মন্তব্য করুন
Front line Bangladesh
অনলাইন সংস্করণ • 28 Aug, 2026 • 01:25 PM
বিজ্ঞাপন (Compact)