আজকের তারিখঃ 27 অক্টোবর, 2026 সময়ঃ 4:46
লগইন
9+
অনলাইন সংস্করণ 5 মিনিটে পড়ুন ARTICLE

ঈদে মিলাদুন্নবী: ইসলামি দৃষ্টিকোণ

Front line Bangladesh 26 Aug, 2026 • 01:18 AM
ছবির ক্যাপশন: ঈদে মিলাদুন্নবী: ইসলামি দৃষ্টিকোণ
মানবতার আকাশ যখন ঘোর অমানিশায় আচ্ছন্ন, চারদিকে হানাহানি, সংঘাত, নৈরাজ্য ও সামাজিক অবক্ষয়—তখন পৃথিবীর প্রয়োজন ছিল একজন শান্তির দূতের। মানুষ যখন মানবিক মূল্যবোধ ভুলে গিয়ে অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছিল, ঠিক সেই সময় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বিশ্বমানবতার জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেন হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে।

তাঁর আগমনে মানবতা নতুন পথের সন্ধান পায়। নৈরাজ্যের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হয় শৃঙ্খলা, অশান্তির পরিবর্তে শান্তি এবং পশুত্বের পরিবর্তে মানবিক মূল্যবোধ। মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ আজও বিশ্বমানবতার জন্য শান্তি, ন্যায় ও কল্যাণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত।

নবীজির প্রতি ভালোবাসা ঈমানের অংশ

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসা একজন মুমিনের ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হাদিসে এসেছে, কোনো ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না রাসুলুল্লাহ (সা.) তার পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততি এবং নিজের জীবনের চেয়েও বেশি প্রিয় হন। (সহিহ মুসলিম: ৪৪; সহিহ বুখারি: ৬৬৩২)

এই ভালোবাসার অন্যতম প্রকাশ হলো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন, চরিত্র, আদর্শ ও সুন্নাহ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন এবং সেগুলো নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা।

মুসলিম উম্মাহর আলেমগণ যুগে যুগে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনচরিত সংরক্ষণ ও সংকলন করেছেন। তাঁর জন্ম, নবুয়ত, দাওয়াত, চরিত্র, পরিবার, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং ইন্তেকাল—জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে।

মিলাদ আলোচনা ও প্রচলিত আয়োজন এক বিষয় নয়

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্ম ও জীবন নিয়ে আলোচনা করা এবং বর্তমান সময়ে প্রচলিত ‘মিলাদ মাহফিল’ বা ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ উদযাপন—এই দুটি বিষয়কে একই হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

সাহাবায়ে কেরাম (রা.) ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সরাসরি সান্নিধ্যপ্রাপ্ত প্রজন্ম এবং তাঁর জীবন ও সুন্নাহর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অনুসারী। তাঁদের যুগে বর্তমানে প্রচলিত পদ্ধতিতে আলাদা কোনো মিলাদ মাহফিল বা জন্মোৎসব পালনের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না। একইভাবে তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনের যুগেও এমন আয়োজনের প্রচলন ছিল না।

এ কারণে কোনো আমলকে দ্বীনের বিশেষ ইবাদত বা সুন্নাহ হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে তার শরিয়তসম্মত ভিত্তি ও প্রথম যুগের মুসলমানদের আমল বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রচলিত মিলাদের ঐতিহাসিক সূচনা

ইসলামি ইতিহাসের কিছু গ্রন্থে উল্লেখ পাওয়া যায়, হিজরি ষষ্ঠ শতকের পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্ম উপলক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে বড় আকারে মিলাদ আয়োজনের প্রচলন শুরু হয়। ইতিহাসবিদ ইবনে কাছির (রহ.) মসুলের শাসক মুজাফ্ফার উদ্দিনের মাধ্যমে রবিউল আউয়াল মাসে জাঁকজমকপূর্ণ মিলাদ আয়োজনের কথা উল্লেখ করেছেন। (আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ: ১৩/১২৭)

তবে এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কেউ প্রচলিত মিলাদকে বিদআত হিসেবে বিবেচনা করেন, আবার কেউ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্ম ও জীবন আলোচনা, দরুদ, দোয়া ও সৎকাজের মাধ্যমে নবীপ্রেম প্রকাশকে বৈধ মনে করেন। তাই বিষয়টি নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও পারস্পরিক সম্মান ও শালীনতা বজায় রাখা জরুরি।

‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ প্রসঙ্গ

ইসলামে ঈদ হিসেবে স্বীকৃত দুটি দিন হলো ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। এ কারণে কোনো দিনকে পৃথকভাবে ‘ঈদ’ হিসেবে নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে শরিয়তসম্মত দলিলের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

যারা ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ পালনের বিরোধিতা করেন, তাঁদের প্রধান যুক্তি হলো—রাসুলুল্লাহ (সা.), সাহাবায়ে কেরাম (রা.) এবং ইসলামের প্রথম যুগের মনীষীদের আমলে এভাবে কোনো বার্ষিক ঈদ বা জন্মোৎসব পালনের প্রমাণ নেই। তাঁদের মতে, দ্বীনের মধ্যে নতুন কোনো নির্দিষ্ট ইবাদত বা আনুষ্ঠানিকতা সংযোজন করা উচিত নয়।

অন্যদিকে, যারা মিলাদ আয়োজনকে বৈধ মনে করেন, তাঁরা বলেন—রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্ম ও জীবন নিয়ে আলোচনা, তাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ, দরুদ পাঠ, কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়া করা মূলত নেক আমল। তবে এসব আয়োজন যেন শরিয়তবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত না হয়, সে বিষয়েও তারা গুরুত্ব দেন।

নবীজির জন্মের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সোমবারের রোজা

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের সঙ্গে সোমবারের একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। সহিহ মুসলিমের হাদিসে হজরত আবু কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, সোমবারের রোজা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই আমার ওপর প্রথম ওহি অবতীর্ণ হয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)

এ ছাড়া সোমবার ও বৃহস্পতিবার বান্দার আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়—এ মর্মে হাদিস রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) পছন্দ করতেন, তাঁর আমলনামা যেন রোজা অবস্থায় আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়। (শামায়েলে তিরমিজি: ২৮৮)

তাই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ, তাঁর জীবন ও আদর্শ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন এবং নফল ইবাদত, বিশেষ করে সোমবারের রোজার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করা যেতে পারে।

নবীপ্রেমের প্রকৃত শিক্ষা

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ভালোবাসা শুধু কোনো নির্দিষ্ট দিনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর প্রকৃত ভালোবাসা হলো তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করা, তাঁর চরিত্র ধারণ করা, সত্য ও ন্যায়ের পথে চলা, মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শন করা এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা।

আজকের বিভক্ত ও সংঘাতপূর্ণ পৃথিবীতে মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা—ন্যায়, সাম্য, সহমর্মিতা, ক্ষমা, মানবিকতা ও শান্তি—আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তাই তাঁর জন্ম ও জীবন নিয়ে আলোচনা করার পাশাপাশি তাঁর আদর্শকে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বাস্তবায়ন করাই হওয়া উচিত আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ, তাঁর আদর্শ ধারণ এবং মানবতার কল্যাণে কাজ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক:
সিনিয়র মুফতি, জামিয়া ইসলামিয়া বায়তুস সালাম, ঢাকা
ডিএমডি ও সিনিয়র শরিয়াহ কনসালটেন্ট, শরিয়াহ অ্যাডভাইজরি অ্যান্ড রিসার্চ কাউন্সিল
ট্যাগ
ঈদে মিলাদুন্নবী: ইসলামি দৃষ্টিকোণ
মন্তব্য করুন
Front line Bangladesh
অনলাইন সংস্করণ • 26 Aug, 2026 • 01:18 AM
বিজ্ঞাপন (Compact)