আজকের তারিখঃ 28 অক্টোবর, 2026 সময়ঃ 2:18
লগইন
9+
অনলাইন সংস্করণ 6 মিনিটে পড়ুন ARTICLE

পলাতক বন্দি ও জামিনে মুক্ত উগ্রবাদীদের ঘিরে নতুন শঙ্কা

Front line Bangladesh 19 Aug, 2026 • 01:44 PM
ছবির ক্যাপশন: পলাতক বন্দি ও জামিনে মুক্ত উগ্রবাদীদের ঘিরে নতুন শঙ্কা

কারাগার ভেঙে পালিয়ে যাওয়া, জামিনে মুক্তি কিংবা পুরোনো মামলায় খালাস—বিভিন্নভাবে কারাগারের বাইরে আসা উগ্রবাদী ও উগ্রবাদসংশ্লিষ্টদের ফের আইনের আওতায় আনতে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা উদ্ধার ও বিস্ফোরণের ঘটনায় পুরোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সদস্যদের নাম সামনে আসায় উদ্বেগ বাড়ছে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর মধ্যে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র বলছে, প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কর্মকর্তাদের বক্তব্যে কিছুটা অনীহা থাকলেও তলে তলে উগ্রবাদীদের গতিবিধির ওপর নজরদারি এবং গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দেশের কয়েকটি কারাগারে হামলা ও বিদ্রোহের ঘটনায় ২ হাজার ২৪০ বন্দি পালিয়ে যায়। কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে এখনো অন্তত ৬৯০ জন পলাতক। এর মধ্যে ১৬৬ জনের পরিচয় ও তথ্যই সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা যাচ্ছে না।

নরসিংদী কারাগার ভেঙে পালানো এসব বন্দির বিষয়ে কারা অধিদপ্তরের নথি কিংবা অনলাইন ব্যবস্থায় তথ্য না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। তাদের কেউ স্বাভাবিক পরিচয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করলেও পলাতক বন্দি হিসেবে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বোমা উদ্ধারের ঘটনায় পুরোনো উগ্রবাদীদের নাম

এরই মধ্যে গত রোববার রাজধানীর ডেমরা থেকে দুটি পাইপ বোমাসহ জুয়েল ভূঁইয়া ও আরিফ চৌধুরী নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) জানিয়েছে, জুয়েল একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য এবং তার সাংকেতিক নাম ‘ওস্তাদ’।

সিটিটিসি ও এটিইউ সূত্রের দাবি, জুয়েল ওরফে ওস্তাদ নব্য জেএমবির বোমা তৈরির কারিগর হিসেবে পরিচিত নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুনের’ ঘনিষ্ঠ সহযোগী। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলার সময় পালিয়ে যাওয়া নয় জঙ্গির একজন ছিলেন জুয়েল। পরে গ্রেপ্তার হলেও জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি আবার সক্রিয় হন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছর কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের পর সামনে আসে ‘বোমারু মামুনের’ নাম। এরপর সাম্প্রতিক কয়েকটি বোমা উদ্ধার ও বিস্ফোরণের ঘটনাতেও তার সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মামুন কয়েক বছর আগে রাজধানীর পান্থপথের হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালে বিস্ফোরণ মামলার আসামি ছিলেন। পরে আদালতের মাধ্যমে মামুনসহ ওই মামলার কয়েকজন আসামি খালাস পান। বর্তমানে তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

খালাসের পরও পুলিশের নজরে মামুন

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র বলছে, আদালত থেকে খালাস পেলেও মামুন এখন পুলিশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহভাজন। তিনি প্রেশার কুকার বোমাসহ বিভিন্ন ধরনের বোমা তৈরিতে দক্ষ বলে দাবি তদন্তসংশ্লিষ্টদের।

তাদের ধারণা, জুয়েলসহ আরও কয়েকজনকে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকতে পারেন মামুন। সম্প্রতি গ্রেপ্তার আরিফ ওরফে ইমরান এবং কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণের পর আত্মগোপনে যাওয়া শেখ আল আমিনের সঙ্গেও মামুনের যোগাযোগ ছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি।

রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় বোমা উদ্ধার এবং বিস্ফোরণের কয়েকটি ঘটনায় মামুন ও তার সহযোগীদের সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর মধ্যে কেরানীগঞ্জে বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণ, যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের ওপর হামলার পর বোমাভর্তি ব্যাগ ফেলে পালানো, কুমিল্লায় মন্দিরে বিস্ফোরণ এবং সায়েদাবাদে তল্লাশির সময় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনাও রয়েছে।

ডেমরা থেকে গ্রেপ্তার জুয়েল ও আরিফকে সোমবার ঢাকার আদালতে হাজির করে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। এটিইউর তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক মো. রফিকুল ইসলাম আদালতে জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিদের ‘দাওলাতুল ইসলাম’-এর সক্রিয় সদস্য হিসেবে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করা, দেশকে অস্থিতিশীল করা এবং নাশকতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনার উদ্দেশ্যে তারা সেখানে একত্রিত হয়েছিল বলে রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

৬৯০ পলাতক বন্দি নিয়ে উদ্বেগ

কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের একটি বড় অংশ এখনো আইনের আওতায় না আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পালিয়ে যাওয়া ২ হাজার ২৪০ বন্দির মধ্যে জঙ্গি, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, যাবজ্জীবন ও বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত বন্দির পাশাপাশি বিচারাধীন মামলার আসামিও ছিল।

পলাতকদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হয়। দেশত্যাগ ঠেকাতে পলাতকদের তালিকা ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছেও দেওয়া হয়। এরপর আত্মসমর্পণ ও বিভিন্ন অভিযানে অনেককে গ্রেপ্তার করা হলেও এখনো ৬৯০ জনের হদিস মেলেনি।

কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, পলাতকদের অনেকের দেওয়া ঠিকানা সঠিক নয়। কেউ কেউ বিদেশেও পালিয়ে থাকতে পারে। তবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি এমন ১৬৬ জনকে নিয়ে উদ্বেগ বেশি। বিভিন্ন স্থানে হামলা ও অগ্নিসংযোগে পুলিশের নথিপত্র নষ্ট হওয়ায় তাদের শনাক্তকরণ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

তবে কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন জানিয়েছেন, পলাতক বন্দিদের মধ্যে ‘টপ টেরর’ কেউ নেই। তাদের কারণে সরাসরি নিরাপত্তা হুমকি তৈরি হয়েছে কি না, পর্যাপ্ত তথ্য ছাড়া তা বলা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে আশঙ্কার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর সঙ্গে নিয়মিত তথ্য বিনিময় করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

উগ্রবাদ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনীহা

দেশের বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরক উদ্ধার, বোমা বিস্ফোরণ ও উগ্রবাদসংশ্লিষ্টতার ঘটনা সামনে এলেও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনীহা দেখা যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে।

মতিঝিল ও সাভারে বোমা উদ্ধারের ঘটনায় সিটিটিসির সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের কথা থাকলেও পরে তা স্থগিত করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, সংবাদ সম্মেলনে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ নিয়ে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে—এ কারণেই তারা গণমাধ্যমের সামনে আসতে চাইছেন না।

তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) নিয়াজ মেহেদী জানিয়েছেন, উগ্রবাদে জড়িতদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে উদ্ধার হওয়া বোমা ও বোমাসদৃশ বস্তু কোনো ধরনের প্রাণহানি ছাড়াই নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হয়েছে।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতেও গোয়েন্দা নজরদারি ও জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত থাকবে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো হবে।

অপরাধ ও সমাজ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বহুমাত্রিক শিক্ষাব্যবস্থা ও বিভিন্ন সামাজিক বাস্তবতায় উগ্রবাদী মতাদর্শ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাই উগ্রবাদে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি কারাগারে থাকা ও মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের সংশোধন ও পুনর্বাসনের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

তার মতে, পুরোনো উগ্রবাদীরা নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা জরুরি।

ট্যাগ
পলাতক বন্দি ও জামিনে মুক্ত উগ্রবাদীদের ঘিরে নতুন শঙ্কা
মন্তব্য করুন
Front line Bangladesh
অনলাইন সংস্করণ • 19 Aug, 2026 • 01:44 PM
বিজ্ঞাপন (Compact)