ডেস্ক রিপোর্ট:
নারীদের জন্য বিশেষ বাসসেবা চালু করেও পরিচালন ব্যয় মেটাতে পারছে না বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা ভাড়ায় জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ ও চালক-শ্রমিকদের বেতনসহ অন্যান্য খরচ মেটানো যাচ্ছে না। ফলে এ সেবায় নিয়মিত ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সরকারকে।
বিআরটিসির একটি সূত্র জানিয়েছে, সারা দেশে নারী বাসসেবার বাসগুলো পরিচালনায় প্রতিদিন অন্তত ৫০ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় লোকসানের পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিআরটিসির ১৯ থেকে ৩১ আগস্ট এবং ১ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেপ্টেম্বরে ১২ কার্যদিবসে ১৫৮টি ট্রিপে ১৪ হাজার ১১৬টি টিকিট বিক্রি হয়েছে। এতে আয় হয়েছে ২ লাখ ২ হাজার ৮ টাকা। আগস্টে ৮ কার্যদিবসে ১১৪টি ট্রিপে ৬ হাজার ৬৮৯টি টিকিট বিক্রি করে আয় হয়েছে ৯৮ হাজার ৬৪৬ টাকা।
মিরপুর-১০ থেকে মতিঝিল রুটের হিসাবেও আয়-ব্যয়ের বড় ব্যবধান দেখা যায়। একমুখী এ রুটের দূরত্ব ২১ কিলোমিটার। যাওয়া-আসা মিলিয়ে এক ট্রিপে বাসটি ৪২ কিলোমিটার চলাচল করে। প্রতি লিটার ডিজেলে ২ থেকে আড়াই কিলোমিটার চললে এক ট্রিপে প্রায় ১৬ দশমিক ৮ থেকে ২১ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। ১১৫ টাকা লিটার হিসাবে এতে জ্বালানি খরচ পড়ে প্রায় ১ হাজার ৯৩২ থেকে ২ হাজার ৪১৫ টাকা।
এর সঙ্গে প্রতি কিলোমিটারে ৭ টাকা হিসাবে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় যোগ হলে এক ট্রিপে জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ খরচ দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ২২৬ থেকে ২ হাজার ৭০৯ টাকা।
সেপ্টেম্বরের ১৫৮টি ট্রিপকে একই রুটের হিসাবে ধরলে বাসগুলো মোট ৬ হাজার ৬৩৬ কিলোমিটার চলেছে। এতে ডিজেল বাবদ আনুমানিক ৩ লাখ ৫ হাজার থেকে ৩ লাখ ৮২ হাজার টাকা এবং রক্ষণাবেক্ষণে আরও প্রায় ৪৬ হাজার ৪৫২ টাকা খরচ হয়েছে। অথচ ওই সময়ে আয় হয়েছে ২ লাখ ২ হাজার ৮ টাকা।
অর্থাৎ, শুধু জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ধরলেও আয়-ব্যয়ের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ ২৬ হাজার টাকার ঘাটতি রয়েছে। এর বাইরে চালকের বেতন, সহকারী ও অন্যান্য কর্মীদের বেতন, টায়ার, লুব্রিকেন্ট, কর, প্রশাসনিক ব্যয় এবং বাসের অবচয় রয়েছে।
আগস্টের হিসাবেও একই ধরনের ঘাটতি দেখা যায়। ১১৪টি ট্রিপে মোট ৪ হাজার ৭৮৮ কিলোমিটার চলাচলে জ্বালানি খরচ হয়েছে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হয়েছে আরও প্রায় ৩৩ হাজার ৫১৬ টাকা। বিপরীতে আয় হয়েছে ৯৮ হাজার ৬৪৬ টাকা।
নারী বাসসেবায় যাত্রীসংখ্যাও প্রত্যাশিত পর্যায়ে নেই। ৬০ আসনের বাসে প্রতি ট্রিপে গড়ে প্রায় ২০টি আসন খালি থাকছে। যাত্রীসংখ্যা বাড়লে আয় বাড়ার সুযোগ থাকলেও সপ্তাহে দুই দিন বাস বন্ধ রাখায় সেবার পরিধি ও সম্ভাব্য আয়—দুটিই সীমিত হচ্ছে।
বিআরটিসির ব্যবস্থাপক মো. নূর-ই-আলম বলেন, নারী যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত নিশ্চিত করতেই এ সেবা চালু করা হয়েছে। তাই শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব দিয়ে সেবাটির প্রয়োজনীয়তা বিচার করা হচ্ছে না। তবে নিয়মিত ভর্তুকির কারণে করপোরেশনের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
তিনি জানান, বাসের সংখ্যা বাড়লে আয়ও বাড়বে এবং ভর্তুকির পরিমাণ কমে আসবে। এক ট্রিপে অন্তত ১২০ জন যাত্রী পাওয়া গেলে ব্যয় ও আয় সমান পর্যায়ে বা ব্রেক-ইভেনে আসবে। এর বেশি যাত্রী পাওয়া গেলে লাভ হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এদিকে সাধারণ গণপরিবহন সপ্তাহের সাত দিন চললেও বিআরটিসির নারী বাসসেবা শুক্রবার ও শনিবার বন্ধ থাকে। বিআরটিসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওই দুই দিনে কর্মজীবী নারী যাত্রী কম থাকায় বাস চলাচল বন্ধ রাখা হয়।
গত ১৮ আগস্ট ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ বা ‘পিংক বাস’ চালু করে বিআরটিসি। প্রাথমিকভাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় ১৩টি রুটে ১৪টি বাস দিয়ে এ সেবা শুরু হয়। এর মধ্যে ঢাকায় ১০টি, চট্টগ্রামে দুটি এবং বগুড়ায় দুটি বাস রয়েছে। ঢাকার বাসগুলোর মধ্যে একটি একতলা এবং নয়টি দ্বিতল বাস।