আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বাইরে তখন প্রলয়ংকরী ঢল। কাদা, পানি আর বিশাল পাথরের চাপে মুহূর্তেই ধসে পড়ে পুরো জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। চারপাশের চিৎকার আর হাহাকার নিমেষেই চাপা পড়ে যায় শত শত টন পলি ও ধ্বংসস্তূপের নিচে। সেই ভয়াবহতার মধ্যেই ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে আটকা পড়েন দুই তরুণ। বাইরের দুনিয়ার কাছে তখন তারা নিখোঁজ তালিকার দুটি নাম।
কিন্তু প্রকৃতি যতটা নির্মম ছিল, জীবন ফিরে পাওয়ার আকুতি ছিল তার চেয়েও প্রবল। নেপালের রসুয়ায় ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রায় ১৭০ মিটার (৫৫৮ ফুট) গভীরে নয় দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে আলোয় ফিরেছেন মেকানিক্যাল ফোরম্যান সঞ্জয় শাহ (৩০) ও মেকানিক্যাল সুপারভাইজার কবির মহারজন। কাদার স্তূপ সরিয়ে তাদের জীবিত উদ্ধারের ঘটনাকে স্বজনরা বলছেন ‘অলৌকিক’।
২৬ আগস্ট সকাল। হিমালয়ের কোলঘেঁষে বয়ে চলা ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর অববাহিকায় তখন তিব্বত সীমান্ত থেকে নেমে আসা হিমবাহ ধসের পানিতে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্পের কন্ট্রোল রুমে দায়িত্বে ছিলেন সপ্তরী জেলার তরুণ সঞ্জয় শাহ। পানি ঢুকতে শুরু করলে সুড়ঙ্গের ভেতরে শুরু হয় জীবন বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সঞ্জয় জানান, ফোরম্যান হিসেবে নিজের জীবনের চেয়ে সহকর্মীদের নিরাপত্তাই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠাতে গিয়ে একপর্যায়ে নিজের বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়।
সুড়ঙ্গের অন্ধকারে নিজেকে শান্ত রাখতে সঞ্জয় একটানা মন্ত্র ও জপ করতে থাকেন। চারপাশ যখন ঘুটঘুটে অন্ধকার এবং বেঁচে ফেরার আশা প্রায় ক্ষীণ, তখনও পাশ থেকে ভেসে আসছিল কয়েকজনের ক্ষীণ আর্তচিৎকার। সঞ্জয়ের ভাষায়, তারা একে অপরকে চিৎকার করে সাহস জোগানোর চেষ্টা করছিলেন।
নয় দিন পর উদ্ধারকারীদের হাতে জীবনের নতুন আলো দেখতে পান সঞ্জয়। সেনা কর্মকর্তাদের কাঁধে চড়ে যখন প্রথমবার বাইরে আসেন, কাদামাখা মুখে সজ্ঞান সঞ্জয়ের প্রথম প্রশ্ন ছিল—‘আজ কী বার?’
অন্যদিকে, কুলেখানি প্রকল্প থেকে রুটিন মেরামতের কাজে ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্পে গিয়েছিলেন কীর্তিপুরের বাসিন্দা কবির মহারজন। কাজ শুরুর আগে স্ত্রী হীরা শোভাকে ফোন করে তিনি জানিয়েছিলেন, তারা ভূগর্ভস্থ অংশে যাচ্ছেন এবং সেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক থাকবে না।
এরপরই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় যোগাযোগ। শুরু হয় দীর্ঘ অপেক্ষা। নয় দিন ধরে স্বামীর ফেরার আশায় কেবল কান্না আর উৎকণ্ঠায় দিন কাটান হীরা শোভা।
কাঠমান্ডুর আর্মি হাসপাতালের আইসিইউতে স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘এই কান্না কষ্টের নয়, স্বস্তির। আমরা খাওয়া-ঘুম সব ভুলে গিয়েছিলাম। কিন্তু মনের এক কোণে বিশ্বাস ছিল, সে ফিরে আসবে। আজ মনে হচ্ছে, আমার স্বামী দ্বিতীয় জীবন পেয়েছে।’
ঘটনার পর সুড়ঙ্গের প্রবেশপথগুলো বিশাল পাথর ও কাদায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। রসুয়াগধি ও ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্পের ভূগর্ভস্থ অংশে পৌঁছাতে উদ্ধারকারীদের প্রায় ছয় দিন সময় লাগে।
সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর (এপিএফ) যৌথ অনুসন্ধানকারী দল জীবন ঝুঁকি নিয়ে প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিটার পলি ও ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে সুড়ঙ্গের মূল অংশে পৌঁছায়। এপিএফের উদ্ধারকারী সদস্য অম্বর মহাত জানান, পাওয়ার হাউসের পাশের একটি অক্ষত ভবনের অংশ থেকে দুই তরুণকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
তবে এই বেঁচে ফেরার গল্পের পাশেই ছিল মৃত্যুর নির্মম বাস্তবতা। একই এলাকা থেকে আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার করেন উদ্ধারকারীরা।
উদ্ধার করা দুই তরুণকে তাৎক্ষণিকভাবে হেলিকপ্টারে কাঠমান্ডুতে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সঞ্জয় শাহ বর্তমানে শঙ্কামুক্ত থাকলেও কবির মহারজনের শারীরিক অবস্থা কিছুটা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
এদিকে, সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত তল্লাশি চালিয়ে আর কোনো সাড়াশব্দ না পাওয়ায় শুক্রবার বিকেলে আপাতত উদ্ধার অভিযান স্থগিত করা হয়েছে।
ভয়াবহ এই হড়পা বানে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২৮৭ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৫ হাজারের বেশি মানুষ।
প্রকৃতির ভয়াল তাণ্ডবে নেপালের নদী অববাহিকা যখন শোক আর স্বজন হারানোর কান্নায় ভারী, তখন সঞ্জয় ও কবিরের ফিরে আসা যেন সেই অন্ধকারে এক টুকরো আলো। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জীবনের জন্য লড়ে যাওয়ার এক অসাধারণ উদাহরণ হয়ে থাকল তাদের নয় দিনের বেঁচে থাকার গল্প।