আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক চাপ ও সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার তীব্র সমালোচনা করেছে চীন। বেইজিং বলেছে, অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি কোনো সমস্যার সমাধান করবে না; বরং এতে উত্তেজনা আরও বাড়তে এবং সংঘাতের প্রভাব অন্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান এ অবস্থান জানান। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখা দেশগুলোর বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়ার পর চীনের পক্ষ থেকে এ প্রতিক্রিয়া আসে।
লিন জিয়ান বলেন, নিষেধাজ্ঞা ও অতিরিক্ত চাপ দিয়ে সমস্যার সমাধান করা যাবে না। এ ধরনের পদক্ষেপ উত্তেজনা বাড়াবে, পরিস্থিতির অবনতি ঘটাবে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে তিনি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে সংযত থাকার এবং দ্রুত সংলাপ ও আলোচনার পথে ফেরার আহ্বান জানান।
চীন-ইরান সহযোগিতা নিয়ে বেইজিংয়ের অবস্থান
ইরানের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা নিয়েও স্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছে বেইজিং।
চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, দুই দেশের সহযোগিতা আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হচ্ছে। তাই এই সহযোগিতা কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত করা উচিত নয়। পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে চীন এবং নিজেদের বৈধ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
চীন এর আগে একাধিকবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেছে। নতুন করে বেইজিং জানিয়েছে, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি দুর্বল করার পাশাপাশি অন্য দেশগুলোর বৈধ স্বার্থের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক অভিযান
চীনের এই প্রতিক্রিয়ার এক দিন আগে, সোমবার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের ওপর নতুন অর্থনৈতিক চাপের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ট্রাম্প প্রশাসন এ উদ্যোগকে ‘Operation Economic Outcast’ নামে অভিহিত করেছে।
বেসেন্ট বলেন, ইরানের অর্থনৈতিক ও আর্থিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখা অন্যান্য দেশ ও প্রতিষ্ঠানের ওপরও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করা হয়।
তবে সোমবার ঘোষণার সময় যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিকভাবে সব ধরনের সম্ভাব্য ‘সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা’ কার্যকর করেনি। বরং ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে।
চীনের জন্য ইরানি তেলের গুরুত্ব
ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। বিশেষ করে জ্বালানি খাতে দুই দেশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও চীন ইরানি তেলের অন্যতম প্রধান ক্রেতা হিসেবে রয়েছে।
তবে ইরান থেকে চীনের তেল আমদানির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণে বিভিন্ন তথ্যসূত্রে পার্থক্য রয়েছে। চীনের সরকারি শুল্ক পরিসংখ্যানে ২০২২ সালের পর ইরান থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির আলাদা তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে ট্যাংকার ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠান Kpler-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীন প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে, যা দেশটির মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ১২ শতাংশ।
এ কারণে ইরানের তেল বাণিজ্যের ওপর নতুন মার্কিন চাপ চীন-ইরান বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগকারী এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন করা হয়।
নোমুরার এপ্রিল ২০২৬ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত তেলের প্রায় ৩৮ শতাংশ এবং এলএনজির প্রায় ২৩ শতাংশ চীনের গন্তব্যে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (EIA) তথ্যও হরমুজের গুরুত্ব তুলে ধরে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ কোটি ৯ লাখ ব্যারেল তেল এবং প্রায় ১১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি এই জলপথ দিয়ে পরিবহন হয়েছে।
ফলে হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে চীনের মতো বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশের ওপর সরবরাহ ও দামের চাপ তৈরি হতে পারে।
নিষেধাজ্ঞার প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ
নতুন মার্কিন পদক্ষেপের লক্ষ্য মূলত ইরানের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর চাপ বাড়ানো। তবে চীনের মতো বড় বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে ইরানের বাণিজ্য অব্যাহত থাকলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নও উঠতে পারে।
অন্যদিকে, চীন যদি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখে এবং যুক্তরাষ্ট্র সেই বাণিজ্যের ওপর সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাহলে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে চীন সরাসরি সংঘাত বাড়ানোর বদলে সংলাপ ও কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে। বেইজিংয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, উত্তেজনা কমানো এবং আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজাই এখন অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
সব মিলিয়ে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক চাপ শুধু ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। ইরানের সঙ্গে চীনের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্বের কারণে এ পদক্ষেপের প্রভাব চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতিতেও পড়তে পারে।