আজকের তারিখঃ 27 অক্টোবর, 2026 সময়ঃ 4:46
লগইন
9+
অনলাইন সংস্করণ 6 মিনিটে পড়ুন ARTICLE

এসআরবির সন্ত্রাসী তালিকায় নেই জিসান

Front line Bangladesh 14 Oct, 2026 • 03:59 PM
ছবির ক্যাপশন: এসআরবির সন্ত্রাসী তালিকায় নেই জিসান

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের আলোচিত নাম জিসান আহমেদ মন্টি। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে অবস্থান করেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অপরাধজগতের ওপর তার প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে সম্প্রতি নবগঠিত রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) আলোচিত সন্ত্রাসীদের তালিকায় তার নাম নেই বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে জানা গেছে। একই তালিকায় নেই রাজধানীর আরেক দুই আলোচিত অপরাধী ফ্রিডম মানিক ও ফ্রিডম মুরাদের নামও।

এসআরবির তালিকা নিয়ে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, গত ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হালনাগাদ করা ‘ব্যাটালিয়ন অনুযায়ী আলোচিত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ সামারি’ শীর্ষক নথিতে সারাদেশের ২ হাজার ২৫৮ জনকে আলোচিত সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট তালিকায় কারও নাম না থাকা মানেই তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির বাইরে—এমন নয় বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

অপরাধজগতে জিসানের উত্থান

জিসান আহমেদ মন্টি ঢাকার রামপুরা, খিলগাঁও ও মালিবাগকেন্দ্রিক অপরাধজগতের আলোচিত নাম। বিভিন্ন অপরাধসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে মহল্লাভিত্তিক চাঁদাবাজির  মধ্য দিয়ে তার অপরাধজগতে উত্থান ঘটে। পরে এসব এলাকায় অপরাধী চক্রের ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে প্রকাশিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় জিসানের নাম ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০০৩ সালে একটি আবাসিক হোটেলে তাকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালানোর সময় গোয়েন্দা পুলিশের দুই সদস্যকে গুলি করে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ২০০৫ সালে গ্রেপ্তার এড়াতে দেশ ছাড়েন তিনি। পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির তথ্যও প্রকাশিত হয়।

২০১৯ সালের ১ অক্টোবর ইন্টারপোলের সহায়তায় দুবাই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করলেও আইনি জটিলতায় তিনি মুক্তি পান বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জিসানের বিরুদ্ধে রামপুরা, বনশ্রী, মালিবাগ ও মগবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, জমি-সংক্রান্ত বিরোধের মীমাংসা এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বর্তমান অবস্থা ও সংশ্লিষ্ট মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।

পলাশ হত্যা ও জিসানের নাম

২০২৬ সালের ১২ জুন দুপুরে রাজধানীর রামপুরা এলাকায় প্রকাশ্যে গুলিবিদ্ধ হন আরেক আলোচিত সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান পলাশ ওরফে ‘কাইল্লা পলাশ’। প্রায় ২৫ বছর কারাভোগের পর মুক্তি পাওয়া পলাশ চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯ জুন ভোরে হাসপাতালে মারা যান।

প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা হিসেবে পলাতক জিসানের নাম উঠে আসে। আধিপত্য বিস্তার ও অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে হত্যাকাণ্ডটি ঘটে থাকতে পারে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে। তবে অভিযোগটির বিষয়ে আদালতে প্রমাণিত কোনো সিদ্ধান্তের তথ্য এখানে পাওয়া যায়নি।

মানিক ও মুরাদের নামও নেই তালিকায়

ঢাকার অপরাধজগতের আরেক আলোচিত নাম জাফর আহমেদ মানিক ওরফে ‘ফ্রিডম মানিক’। আশির দশক থেকে অপরাধজগতের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মতিঝিল, পল্টন, খিলগাঁও, সবুজবাগ, শাহজাহানপুর ও রামপুরা এলাকায় তার প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দেশের বাইরে অবস্থান করেও অনুসারীদের মাধ্যমে অপরাধজগতের ওপর প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে।

তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত নাজমুল মাকসুদ মুরাদ ওরফে ‘ফ্রিডম মুরাদ’-এর নামও নতুন তালিকায় নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা থেকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারের পর তাকে বাংলাদেশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এসআরবির নথিতে মালিবাগ, খিলগাঁও, শাহজাহানপুর ও মুগদা এলাকার জন্য আলোচিত সন্ত্রাসী হিসেবে কোনো নাম তালিকাভুক্ত নেই বলেও দাবি করা হয়েছে।

তালিকা নিয়ে এসআরবির বক্তব্য

এসআরবির লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী  বলেন, পুরস্কার ঘোষিত মোস্ট ওয়ান্টেড জিসানের নাম তালিকায় রয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই না করে নিশ্চিতভাবে বলা সমীচীন হবে না।

তিনি আরও বলেন, কোনো অপরাধীর নাম নির্দিষ্ট তালিকায় না থাকার অর্থ এই নয় যে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির বাইরে রয়েছেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, অপরাধীদের বিরুদ্ধে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য, সংশ্লিষ্ট মামলার অগ্রগতি এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে এসআরবি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

সারাদেশে ২,২৫৮ আলোচিত সন্ত্রাসী

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসআরবির ১৫টি ব্যাটালিয়নের তালিকায় আলোচিত সন্ত্রাসী হিসেবে ২ হাজার ২৫৮ জনের নাম রয়েছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা এসআরবি-১১-এর তালিকায় সর্বোচ্চ ৪০৮ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ময়মনসিংহ অঞ্চলে ২৩৯ জন, সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে ৩২৪ জন, চট্টগ্রাম অঞ্চলে ২৭৭ জন, রাজশাহীতে ২১৬ জন, খুলনায় ২১৪ জন এবং সিলেটে ১৯৫ জনের নাম রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজের তালিকায়ও আঞ্চলিক পার্থক্য

এসআরবির নথি অনুযায়ী, ছিনতাইকারী হিসেবে ৫৩৪ জনের নাম তালিকাভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর, আদাবর ও আশপাশের এলাকার দায়িত্বে থাকা এসআরবি-২-এর তালিকায় ১৩০ জনের নাম রয়েছে। মিরপুর অঞ্চলে ১১২ জন এবং কেরানীগঞ্জ ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ১০৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

চাঁদাবাজির তালিকায় নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের এসআরবি-১১-এর অধীনে ৫৬৫ জনের নাম রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের এসআরবি-৭-এর তালিকায় রয়েছে ৫০৩ জনের নাম। এই দুই ব্যাটালিয়নের তালিকায় মোট ১ হাজার ৬৮ জনের নাম রয়েছে।

এদিকে, ঢাকা ও আশপাশের পাঁচটি ব্যাটালিয়নের তালিকায় চাঁদাবাজ হিসেবে ১ হাজার ২৫৪ জনের নাম রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চাঁদাবাজির অভিযোগে দুই বিএনপি নেতা আটক

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৫ অক্টোবর চাঁদাবাজির অভিযোগে খিলক্ষেত থানা বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি শাহিনুর আলম মারফত এবং শেরেবাংলা নগর থানা বিএনপির ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি মিজানুর রহমান স্বপনকে আটক করে এসআরবি।

পরে শাহিনুর আলম মারফতকে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে এবং স্বপনকে শেরেবাংলা নগর থানায় হস্তান্তর করা হয়। শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম জানান, চাঁদাবাজির অভিযোগে করা একটি পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে স্বপনকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

স্বপনের বিরুদ্ধে পোশাক কারখানা, হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স কার্যক্রম, ফুটপাত ও বস্তিকেন্দ্রিক চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে বলে এসআরবি সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

শিল্পাঞ্চলে চাঁদাবাজি দমনে অভিযান

শিল্পাঞ্চলভিত্তিক চাঁদাবাজি ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করেছে এসআরবি। সংস্থাটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তালিকার ভিত্তিতে গত দুই মাসে শিল্পাঞ্চলে অভিযান চালিয়ে চাঁদাবাজিসংক্রান্ত মামলায় ২৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এসআরবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অপরাধের ধরন, মাত্রা, অপরাধীদের অবস্থান ও গোয়েন্দা তথ্যের গুরুত্ব বিবেচনায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে। অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ও জোরদার করা হচ্ছে।

ট্যাগ
এসআরবির সন্ত্রাসী তালিকায় নেই জিসান
মন্তব্য করুন
Front line Bangladesh
অনলাইন সংস্করণ • 14 Oct, 2026 • 03:59 PM
বিজ্ঞাপন (Compact)