কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন যশোরের মণিরামপুরের এক দম্পতি ও তাঁদের দুই শিশুকন্যা। রিসোর্টের শৌচাগার থেকে উদ্ধার হওয়া চারটি দগ্ধ মরদেহ তাঁদের হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্বজনেরা। তবে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় পরিবারটির ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নিখোঁজরা হলেন মণিরামপুর হাসপাতাল মোড়সংলগ্ন মোহনপুর এলাকার মতিয়ার রহমানের ছেলে নাহিদুর রহমান তুহিন (৪১), তাঁর স্ত্রী আফসানা মতিন তানজি (৩৬) এবং তাঁদের দুই মেয়ে রুজাইনা ইনায়া (৭) ও সুনাইনা ইহানা (৩)।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, তুহিন ঢাকার শ্যামলীতে অবস্থিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডে কর্মরত ছিলেন। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি রাজধানীর মিরপুরে বসবাস করতেন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে যাওয়ার বিষয়টি বাবাকে মুঠোফোনে জানিয়েছিলেন তিনি।
শুক্রবার মধ্যরাত থেকেই বন্ধ চার সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ
তুহিনের চাচাতো ভাই ও মণিরামপুর হাসপাতাল মোড়ের ওষুধ ব্যবসায়ী রিয়াজ উদ্দিন জানান, শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে ওঠেন তুহিন। দুই দিন সেখানে অবস্থান শেষে রোববার তাঁদের রিসোর্ট ছাড়ার কথা ছিল।
কিন্তু শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টার পর থেকেই তুহিনের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। শনিবার সকালে রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে তাঁর স্ত্রী তানজির ফোনেও যোগাযোগের চেষ্টা করেন স্বজনেরা। সেটিও বন্ধ পাওয়া যায়।
রিয়াজ উদ্দিনের দাবি, তাঁদের মুঠোফোনের সর্বশেষ অবস্থান রিসোর্ট এলাকাতেই দেখা যাচ্ছিল।
দিনভর বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও নিখোঁজ পরিবারের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
শৌচাগারে চার মরদেহ, পরিবারজুড়ে উৎকণ্ঠা
শনিবার সন্ধ্যায় রিসোর্টের শৌচাগার থেকে পরস্পরকে জড়িয়ে থাকা অবস্থায় চারজনের দগ্ধ মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া যায়। এরপর থেকেই নিখোঁজ তুহিন, তাঁর স্ত্রী ও দুই শিশুকন্যার বেঁচে থাকা নিয়ে গভীর শঙ্কায় রয়েছেন স্বজনেরা।
খবরটি ছড়িয়ে পড়লে মণিরামপুরের মোহনপুর এলাকায় শোকাবহ পরিবেশ তৈরি হয়।
তুহিনের বড় ভাই জাহিদুর রহমান প্রিন্স জানান, শনিবার থেকে ছোট ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না তিনি। পরিবারের সদস্যদের প্রকৃত অবস্থা জানতে রোববার সকালে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন।
তিনি বলেন, ‘তুহিন ও তার স্ত্রী, দুই মেয়ে বেঁচে আছেন কি না, আমরা নিশ্চিত নই। কক্সবাজারে পৌঁছালে প্রকৃত অবস্থা জানতে পারব।’
ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়: পুলিশ
মণিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু সাঈদ জানান, কক্সবাজারের রিসোর্টে যে কক্ষের শৌচাগার থেকে এক দম্পতি ও দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, নিখোঁজ তুহিনের পরিবার ওই কক্ষেই অবস্থান করছিল বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন।
তবে উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলো তুহিন ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের কি না, তা ডিএনএ পরীক্ষার আগে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।
অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০, মরদেহ শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষা
প্রসঙ্গত, শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে মোট ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মরদেহগুলো মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় চেহারা দেখে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে সেগুলো কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে।
প্রশাসন জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান (৩০), মিলিতা মেহেজাবিন (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান (২৭), নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) ও ফায়িজান আহম্মেদ (৫)।
বাকি চারটি মরদেহের পরিচয় এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। ডিএনএ পরীক্ষার ফল পাওয়ার পরই মরদেহগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
এদিকে নিখোঁজ তুহিনের পরিবারের সন্ধানে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় সময় পার করছেন স্বজনেরা। দুই শিশুকন্যাসহ চার সদস্যের ভাগ্যে কী ঘটেছে, সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে এখন ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁরা।