আজকের তারিখঃ 27 অক্টোবর, 2026 সময়ঃ 4:49
লগইন
9+
অনলাইন সংস্করণ 5 মিনিটে পড়ুন ARTICLE

মেটার জবাবদিহি নিশ্চিত না করে কঠোর আইনেও অপতথ্য ঠেকানো সম্ভব নয়: টিআইবি

Front line Bangladesh 18 Oct, 2026 • 06:20 PM
ছবির ক্যাপশন: মেটার জবাবদিহি নিশ্চিত না করে কঠোর আইনেও অপতথ্য ঠেকানো সম্ভব নয়: টিআইবি

ফ্রন্টলাইন বাংলাদেশ | নিজস্ব প্রতিবেদক

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জায়ান্ট মেটার (ফেসবুক) মুনাফাকেন্দ্রিক অ্যালগরিদম ও প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি নিশ্চিত না করে শুধু কঠোর আইন প্রণয়নের মাধ্যমে অপতথ্য ও সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

তিনি বলেন, অংশীজনদের মতামত উপেক্ষা করে বিতর্কিত কাঠামোয় প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন পাস করা হলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য ক্ষতিকর হবে। একই সঙ্গে এটি সরকারের জন্যও বুমেরাং ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে পারে।

রোববার (১৮ অক্টোবর) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন নিয়ে নাগরিক সমাজের ১৯টি সংগঠন ও সম্প্রতি গঠিত গণমাধ্যম কমিটির মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

মেটার অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবি

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিশ্বের যেসব দেশ অপতথ্য নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে অপতথ্য ও ভুয়া খবর ছড়িয়ে পড়ার পেছনে প্ল্যাটফর্মগুলোর আর্থিক মুনাফার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তিনি অভিযোগ করেন, ব্যবসা সম্প্রসারণের স্বার্থে মেটা সংঘাত ও সহিংসতামূলক বক্তব্যকে বেশি প্রচার করে, অথচ ধর্মনিরপেক্ষ ও যৌক্তিক আলোচনার ক্ষেত্রে সেন্সরশিপের অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রযুক্তি ব্যবসার অশুভ আঁতাতের কারণে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জবাবদিহি নিশ্চিত না করে সাধারণ নাগরিকদের ওপর কঠোর আইন চাপিয়ে দেওয়া কোনো টেকসই সমাধান নয়।

সহিংসতা প্রতিরোধে ফেসবুকের জবাবদিহি প্রয়োজন

আলোচনায় ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। ২০১২ সালে রামুতে বৌদ্ধপল্লিতে হামলা ও ২৫টি প্যাগোডা ভাঙচুর, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেওয়া এবং সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুকে সংঘবদ্ধভাবে মব তৈরি করে পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার দেখা গেছে।

তিনি বলেন, ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাৎক্ষণিক সমন্বয়ের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় এ ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের ২৬(ক) ধারা বাদ দেওয়া, ২৫ ধারায় মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য না করা, ৮(৩) ধারার অপব্যবহার রোধ এবং সাংবাদিকদের বিচারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ব্যবস্থা বাতিলের বিষয়ে বৃহত্তর ঐকমত্য রয়েছে বলেও জানান তিনি।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সার ও ইউটিউবারদের মাধ্যমে চরিত্রহনন এবং লাগামহীন অপপ্রচার ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থাও প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন শফিকুল আলম।

যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে তিনি মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধের পরিবর্তে দেওয়ানি আইনের আওতায় এনে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিধান করার পরামর্শ দেন।

তদন্ত কর্মকর্তাদের ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ

প্রস্তাবিত আইনের বিভিন্ন ধারা ও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম।

তিনি বলেন, প্রস্তাবিত আইনটি দেখে মনে হচ্ছে, এটি ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের সুরক্ষার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এতে গণমাধ্যমকর্মীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একজন ব্যক্তির অপরাধ বা ভুলের কারণে পুরো গণমাধ্যম বা মিডিয়া হাউস বন্ধ করে দেওয়ার মতো বিধানও রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

শহীদুল ইসলাম আরও বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে গণমাধ্যমের ডেটা সেন্টারসহ প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি জব্দ করার ক্ষমতা পেলে একটি পুরো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ ছাড়া মানহানির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা না থাকাও উদ্বেগজনক।

তৃণমূল পর্যায়ের সংবাদকর্মীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও মতামত বিবেচনায় নিয়ে গ্রহণযোগ্য আইন প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।

সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্বের দাবি

রাজনীতি ডটকমের সম্পাদক ও প্রকাশক শরীফুজ্জামান পিন্টু প্রস্তাবিত আইনের দায়মুক্তির বিধান, অপরাধের অস্পষ্ট সংজ্ঞা এবং অনলাইন কনটেন্ট ব্লকের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, সাংবাদিকতা ও মূলধারার গণমাধ্যম যাতে আইনের অপপ্রয়োগের শিকার না হয়, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট সুরক্ষা থাকা প্রয়োজন।

জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের প্রস্তাবিত কাঠামো নিয়েও আপত্তি জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীকে প্রধান করে পাঁচজন মন্ত্রী, নয়জন সচিব এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের নিয়ে কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত হচ্ছে না।

শরীফুজ্জামান পিন্টু বলেন, নির্বাহী বিভাগের হাতে এভাবে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য শুভ নয়। তিনি কাউন্সিলে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ সদস্য হিসেবে মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান।

নিবর্তনমূলক ধারা বাতিলের আহ্বান

সমাপনী বক্তব্যে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের সুরক্ষার প্রশ্নে নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যম একই পথের যাত্রী। এ ক্ষেত্রে দুই পক্ষের মধ্যে সমন্বয় ও ঐক্য জরুরি।

তিনি প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের নিবর্তনমূলক ধারাগুলো বাতিল করে নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে আইনটি সংশোধনের আহ্বান জানান।

সভায় বক্তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জবাবদিহি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের আইনি সুরক্ষা এবং সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় স্বচ্ছ ও ভারসাম্যপূর্ণ আইন প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ট্যাগ
মেটার জবাবদিহি নিশ্চিত না করে কঠোর আইনেও অপতথ্য ঠেকানো সম্ভব নয়: টিআইবি
মন্তব্য করুন
Front line Bangladesh
অনলাইন সংস্করণ • 18 Oct, 2026 • 06:20 PM
বিজ্ঞাপন (Compact)