বিশেষ প্রতিবেদনঃ
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশের বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। রাজনৈতিক মেরূকরণের প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন এই সরকারের প্রথম ১৬১ দিন পার হয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার প্রথম ১৬১ দিনের মধ্যেই নির্বাচনী ইশতেহারের একাধিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেছে।
ইশতেহারের বলা হয়েছে যে, ১৭ বছর পর একটি বড় রাজনৈতিক পালাবদলের মাধ্যমে ১৭ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতায় আসা সরকারটি প্রথম ১৬১ দিন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং গভীর সামাজিক বিভাজন মোকাবিলায় ব্যয় করেছে। রাজনৈতিক অচলাবস্থা, ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা ও গভীর সামাজিক বিভাজনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সরকার গঠন করে বিএনপি। দায়িত্ব গ্রহণের শুরু থেকেই নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণের বাড়তি চাপ নিতে হয়েছে এই সরকারকে।
যেখানে নতুন করে চেপে বসা জ্বালানি সংকট এবং হাম পরিস্থিতিও সরকারকে বেশ ভুগিয়েছে। শুরু থেকেই সামাজিক নিরাপত্তা খাতে নেওয়া কিছু পদক্ষেপ যেমন প্রশংসিত হয়েছে, তেমনি কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সমালোচনার মুখেও ফেলেছে এই সরকারকে। সরকার ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে একাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা জনজীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন এনেছে।
সামাজিক সুরক্ষা ও কল্যাণ প্রকাশনার প্রতিবেদন অনুসারে, ৫৩,০৯৬ পরিবার ফ্যামিলি কার্ড এবং ২০,৭৪৮ পরিবারকে ফার্মার্স কার্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, প্রায় ৫৫ লাখ পরিবার প্রতি কেজি ১৫ টাকা দরে ভর্তুকিযুক্ত চাল পাচ্ছে এবং প্রবীণ নাগরিক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা মেট্রোরেল ও ট্রেন সেবায় ২৫ শতাংশ ভাড়া ছাড় পাচ্ছেন। সরকার জুলাই মাসের আন্দোলনে আহত ১৫২ জনের জন্য রাশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থাও করেছে। অর্থনীতি ও অর্থায়ন ই-বুকে বলা হয়েছে, ২০ মে পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৪.৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে এবং মুদ্রাস্ফীতি কমে ৮.৭১ শতাংশে নেমে এসেছে।
এছাড়াও, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে রাজস্ব আদায় ১৩.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, চাপের মুখে সরকার ভর্তুকির মাধ্যমে রান্নার তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করেছে। কৃষি, অবকাঠামো এবং যোগাযোগ সারাদেশে ৬৬৬টি খালে পুনঃখননের কাজ শুরু হয়েছে। পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা থেকে জনসংখ্যার ৩৭ শতাংশ সরাসরি উপকৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এদিকে, জাতীয় বিমান সংস্থার বিমানবহর সম্প্রসারণে ১৪টি বোয়িং বিমান যুক্ত করার একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং স্থল পরিষেবা গুলোও সম্পূর্ণরূপে ডিজিটাল করা হয়েছে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মসংস্থান ই-বুকে বলা হয়েছে, ২০ মিলিয়নেরও বেশি শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে, যা প্রায় সর্বজনীন কভারেজ অর্জন করেছে। প্রায় ৬৫,৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়েছে। সরকার ঈদের আগেই সকল শিল্প শ্রমিকের বেতন, বোনাস ও ভাতা পরিশোধ নিশ্চিত করেছে।
খেলাধুলা ও ধর্মীয় বিষয় ১২-১৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নতুন কুড়ি ক্রীড়া কর্মসূচি চলমান রয়েছে এবং ৫৫০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ক্লাবে ক্রীড়া সরঞ্জাম বিতরণ করা হয়েছে। প্রায় ৬ হাজার প্রতিষ্ঠানে ইমাম, মুয়াজ্জিন ও অন্যান্য ধর্মীয় নেতাদের মাসিক ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। ঈদের আগে ৩৮ হাজারেরও বেশি কসাইকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষা, সার্বভৌমত্ব এবং পররাষ্ট্র বিষয়ক স্থলভাগের ৬৫০ কিলোমিটার অভ্যন্তরভাগ এবং বঙ্গোপসাগরের ৮৩৩ কিলোমিটার পর্যন্ত আকাশসীমা পর্যবেক্ষণের জন্য একটি আধুনিক গ্রাউন্ড মাস্টার-৪০০ রাডার সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া, সরকার বাংলাদেশি পাসপোর্টে ‘ইসরায়েল ছাড়া’ বাক্যটি পুনরায় চালু করছে, যা পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকার সরিয়ে দিয়েছিল।
দুর্নীতি দমন ও শাসন ই-বুকে বলা হয়েছে, এস আলম গ্রুপের ৪,২৬৪ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। “পাচার করা অর্থ উদ্ধারের জন্য তিনটি দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং অন্যদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এতে আরও বলা হয়েছে যে, ২৪ মে পর্যন্ত ১০টি মন্ত্রিসভার বৈঠকে ৬০টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৩৭টি বাস্তবায়িত হয়েছে এবং ২৩টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মাত্র ১৫৪ দিনের বিবেচনায় পাঁচ বছর মেয়াদি সরকারের সফলতা-ব্যর্থতা মূল্যায়নের সুযোগ না থাকলেও শুরুটা কেমন হলো, এটাও গুরুত্বপূর্ণ।
তাদের মতে, এই সময়ে নির্বাচনি ইশতাহার বাস্তবায়নে মনোযোগ দেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের জন্য খাতভিত্তিক কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপও নিয়েছে সরকার। যেখানে কিছু ক্ষেত্রে সফলতার ইঙ্গিত মিললেও এখনও অধরাই রয়ে গেছে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ খাত।
বিশেষ করে দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারের ভূমিকা এখনও তেমন কার্যকর হয়নি বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা। যদিও ভঙ্গুর অবস্থা থেকে দেশের অর্থনীতিকে সামাল দেওয়ার যে চ্যালেঞ্জ সরকারের সামনে রয়েছে, সেখানে কতটা সফল হবে, সেটা বুঝতে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে বলেই মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তারা ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনে কাজ করছে এবং বেশিরভাগ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মন্ত্রিসভায় গৃহীত ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের প্রায় ৬২ শতাংশ ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। অর্থনৈতিক সংস্কার বড়ো চ্যালেঞ্জ সরকারের প্রথম একশ দিনের সবচেয়ে বড়ো পরীক্ষা ছিল দেশের অর্থনীতি। ব্যাংক খাতের সংস্কার, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখাই ছিল আলোচনায়। যার সঙ্গে বাড়তি চ্যালেঞ্জ হিসেবে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রেক্ষাপট। সব মিলিয়ে সরকারের এই সময়কালকে মূলত ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট বা সংকট ব্যবস্থাপনার সময় হিসেবেই বিবেচনা করছেন অর্থনীতিবিদরা। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে নেওয়া কিছু পদক্ষেপে সরকার যেমন ইতিবাচক বার্তা দিতে পেরেছে, তেমনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়োগসহ বেশি কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনার মুখেও পড়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকার তার নির্বাচনি ইশতেহার ও ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে বেশ কিছু জনবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডি এর সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক ঋণ-এর মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণের বার্তা দিয়েছে সরকার। তবে বিনিয়োগ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে এখনও তেমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। পাশাপাশি অর্থনীতির বেশ কিছু সূচকে উদ্বেগ এখনও কাটেনি বলেই মনে করেন তিনি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এরই মধ্যে আর্থিক খাতে বড়ো ধরনের পরিবর্তন আনতে পারবে সেটি আশা করা ঠিক হবে না। তবে নীতিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ভবিষ্যতের বার্তা পাওয়া যেতে পারে। এবারও রেভিনিউ টার্গেট পূরণ হবে না, সরকার ব্যাংক থেকে বড়ো মাপের লোন নিচ্ছে- সব মিলিয়ে আগের পুঞ্জীভূত সমস্যাগুলো এখনও অব্যাহত আছে, কিছু কিছু জায়গায় আরও ঘনীভূত হয়েছে,” বলেই মনে করেন মি. রহমান। অবশ্য, সরকারের এই সময়ে রেমিটেন্স প্রবাহ ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে বলেই জানান তিনি। যদিও ব্যাংকিং আইনে আনা সংশোধন এবং কেন্দ্রিয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগসহ এই খাতের সংস্কারে সরকারের বেশ কিছু পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই সমালোচিত হয়েছে। কিন্তু ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে সরকার কী করতে চায় সেটি এখনও স্পষ্ট নয় বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এক্ষেত্রে সরকারকে অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা বলছেন অর্থনীতিবিদরা।
এছাড়া, দেশের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে বড়ো ধরনের সংকোচন দেখা গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য চ্যালেঞ্জ বলেই মনে করেন অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ। তারা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এখনও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে বড়ো চাপ তৈরি করছে। বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো এখনও কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। ব্যাংকিং খাতে অস্থিতিশীলতা এবং খেলাপি ঋণের হার এখনও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান দুর্বলতা বলেই মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ায় সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও ভর্তুকি দেওয়ার সক্ষমতা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি এবং আর্থিক শৃঙ্খলার জন্য কিছু পদক্ষেপ নিতে পেরেছে সরকার। তবে, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং বাজারে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সফল হওয়া সরকারের জন্য বড়ো পরীক্ষা।
অর্থনীতিবিদের মতে, কাঠামোগত সংস্কার যেমন- কর ব্যবস্থা ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ছাড়া কেবল মাত্র প্রশাসনিক উদ্যোগে এই চ্যালেঞ্জগুলো স্থায়ীভাবে মোকাবিলা করা কঠিন হতে পারে। এখনও নড়বড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকেই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বিশেষ করে সারাদেশে ‘মব ভায়োলেন্স’ নিয়ে তীব্র সমালোচনা রয়েছে তখন থেকেই। রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হবে বলেই মনে করা হয়েছিল। কিন্তু পরিস্থিতি খুব একটা বদলায়নি বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষ করে ধর্ষণ, হত্যা এবং ছিনতাইয়ের মতো ঘটনাগুলো এখনও সাধারণ মানুষের কাছে অস্বস্তির কারণ হয়ে রয়েছে বলেই মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ। তিনি বলছেন, “নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলো আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী কিংবা নিরাপত্তাসংক্রান্ত সমস্ত ম্যাকানিজম বা বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের যে আস্থা নাই সেটি ফুটে উঠেছে, এটি প্রত্যাশিত ছিল না। পুলিশের ভূমিকা নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়েছে এই বিশ্লেষকের।
তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক ও অপরাধমূলক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে। সম্প্রতি কালশি থেকে পুলিশ যেভাবে দৌড়ে পালিয়েছে, এটি খুবই দৃষ্টিকটু ছিল। তার মানে পুলিশ এখনও নিজেদের সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি, পেশাদারিত্বের জায়গায় আসতে পারেনি।যদিও, মাঠ পর্যায় থেকে সেনাবাহিনীকে ধাপে ধাপে সরিয়ে নেওয়া এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া- এই পদক্ষেপগুলোকে পরিস্থিতি উন্নতির নির্দেশক হিসেবেও দেখা হচ্ছে। সম্প্রতি মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে সরকার। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার বিষয়টি নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। এছাড়া র্যাবের কর্মকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিনের যে বিতর্ক, সেখান থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসা বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ বলেই মনে করা হচ্ছে। র্যাব বিলুপ্ত করার দাবি এক সময় বিএনপির এজেন্ডায় থাকলেও, সরকার এখন এটিকে বিলুপ্ত না করে একটি আইনি কাঠামোয় এনে পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি হয়েছে, সরকারের পক্ষ থেকে এমন দাবি করা হলেও- ছিনতাই, মাদক ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধ এখনও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি শান্তি নিশ্চিত করতে প্রশাসনের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক ও কাঠামোগত স্বচ্ছতা জরুরি, যা এখনো পূর্ণতা পায়নি। রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও অন্য ইস্যু রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারকে শুরু থেকেই নানামুখী রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে, এমন বার্তা আগেই পাওয়া গিয়েছিল। এছাড়া জাতীয় সংসদে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সামাল দেওয়াও বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড়ো পরীক্ষা হবে বলেই আভাস দিয়েছিলেন বিশ্লেষকরা। যার নজির সংসদের প্রথম অধিবেশনেই দেখা গেছে বলে মত বিশ্লেষকদের। তারা বলছেন, জুলাই সনদসহ নানা ইস্যুতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। এক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত বর্তমান সরকার বেশ ভালো ভূমিকা রেখেছে বলেই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান।
তিনি বলছেন, সরকার একদিকে সংহতি বজায় রাখার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে জুলাই আন্দোলনের চেতনা ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এখন পর্যন্ত সরকার বিরোধী দলগুলোর সাথে সংঘাত এড়িয়ে আলোচনার পরিবেশ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে, যা একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার লক্ষণ, বলেই মনে করেন তিনি। তবে জুলাই সনদ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলো নিয়ে সরকারকে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে, না হলে ভবিষ্যতে এ নিয়ে জটিলতা তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে শপথ গ্রহণের দিন থেকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিরুদ্ধ অবস্থান নেওয়ায় সংসদে বিরোধী দলের সমালোচনার মুখে পড়েছে বিএনপি। তারা সংসদের বাইরেও আন্দোলন করার ঘোষণা দিয়েছে। তবে সরকার শুরু থেকেই নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দিকে মনোযোগী হয়েছেন, যার মধ্য দিয়ে ‘এক ঢিলে দুই পাখি’ মারার মতো কাজ করছে বলেই মনে করেন মি. খান। তিনি বলছেন, “সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ডের মতো সামাজিক নিরাপত্তার পদক্ষেপগুলো আগে বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে, যার মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে তাদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছে, অন্যদিকে বিরোধীদেরকেও পাল্টা বার্তা দিচ্ছে। কারণ এগুলো নিয়ে অতীতে কটাক্ষ করেছিল বিরোধীরা। অর্থনীতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার বিষয়টি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে বিশ্লেষকরা।
“দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি না হলে শিগগিরই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা সরকারকে চাপে আরো ফেলবে,” বলেন মি. খান। অন্যান্য চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি একশ দিনের এই সরকারকে বেশ ভোগাচ্ছে হাম ইস্যু। ইতোমধ্যে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে ছয়শর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। হাম ইস্যুতে আগের সরকারকে দায়ি করা হলেও স্বাস্থ্য খাতে তৈরি হওয়া এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বর্তমান সরকারের ভূমিকা নিয়েও নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। যদিও দেশে হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে প্রায় ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করে দেশব্যাপী ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি শুরু করার কথা জানিয়েছে সরকার। এছাড়া দেশের স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। বর্তমান সরকার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ১৫০দিনের কর্মসূচি নিয়ে সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছেন, সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, সুশাসন, জনকল্যাণ এবং মানুষের প্রত্যাশা পূরণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিগত দিনের ভেঙে পড়া রাষ্ট্র কাঠামোকে পুনরুদ্ধারে ম্যান্ডেট পেয়েছেন গণমানুষের নেতা বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দায়িত্ব হাতে নিয়ে অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মাঝেই তিনি মানুষের আস্থার চূড়ায় অবস্থান করছেন।’
গত পাঁচ মাসে জনগণের আস্থা ভালোবাসা ও সমর্থন ইশতেহারের আলোকে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বার্থ রক্ষায় স্বল্প সময়ের মধ্যে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সফলতা অর্জনে বর্তমান সরকার দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর থেকে ২৪শে মে পর্যন্ত মন্ত্রিসভার ১০টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। যেখানে মোট ৬০টি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৩৭টি ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে।উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা সরকারের প্রশাসনিক গতিশীলতার বড়ো প্রমাণ বলেই উল্লেখ করেন।
এছাড়া, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষর এবং এস আলম গ্রুপের প্রায় ৪ হাজার ২৬৪ কোটি টাকার সম্পদ জব্দের মাধ্যমে সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরকার অগ্রাধিকার দিয়েছে বলে জানান মি. আমিন। মুখপাত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের কৃষি ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনতে ‘কৃষক কার্ড’ চালু করা হয়েছে। এছাড়া ক্ষুদ্র কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনায় ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্পসহ দেশজুড়ে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়েছে। সরকার বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বলেও দাবি করেন মি. আমিন। এক্ষেত্রে, মেহেরপুরের একটি ধর্ষণ মামলায় ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড প্রদান এবং পল্লবীর শিশু হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ায় সরকারের সরাসরি তদারকির প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন তিনি। জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে গঠিত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের সরকারের মাত্র ১৫০ দিনের পথচলায়ই দেশের নানা ক্ষেত্রে দৃশ্যমান, সুস্পষ্ট ও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়েছে। একইসঙ্গে জনমনে সৃষ্টি হয়েছে ক্ষমতায়ন, আশা-আকাঙ্খা ও প্রত্যাশার এক নতুন, দৃঢ় ও ইতিবাচক মেলবন্ধন।
তিনি আরো বলেন, নির্বাচিত সরকার বিশ্বাস করে, গণতন্ত্র সুসংহত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এমন নীতিগত সহায়তা প্রদান করা, যেখানে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিক বৈষম্যহীনভাবে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সমান সুযোগ পান এবং দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় অবদান রাখতে পারেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং ১৬ বছরের গণতান্ত্রিক পথচলায় শহীদদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান অঙ্গীকারবদ্ধ। ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত- এই সম্মিলিত শক্তিই দেশের অগ্রগতির মূল ভিত্তি। এই কারণেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন করবো কাজ, গড়বো দেশ। সবার আগে বাংলাদেশ।
গত ১৮ জুলাই শনিবার বিকাল সাড়ে ৩টায় প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ের ‘করবী’ হলে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ মাস পূর্তি উপলক্ষ্যে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে প্রধানমন্ত্রী প্রেস উইং।