নিজস্ব প্রতিবেদক
পুলিশের পরিবহন সংকট দূর করা ও কার্যক্রমের সক্ষমতা বাড়াতে ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ হাজার ৮৩০টি যানবাহন কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে দুটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে, যা আগামী ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের ১ হাজার ৭৪টি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে ৪৫৫টি গাড়ি পুরোপুরি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এতে পুলিশের পরিবহন সংকট আরও বেড়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, দেশের ৬৩৯টি প্রশাসনিক থানায় বর্তমানে মাত্র ১ হাজার ২৩৭টি গাড়ি রয়েছে। এসব গাড়ির ৬৪ শতাংশের বয়স ১০ বছরের বেশি। ফলে নিয়মিত টহল, অপরাধ তদন্ত ও জরুরি সেবা কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে পুলিশকে।
দুটি প্রকল্পের আওতায় যানবাহন কেনা হবে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৮২৯টি অপারেশনাল যানবাহন কেনার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪ হাজার ৩২৮ কোটি ৯২ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। অন্যদিকে, ১ হাজার ১টি বিশেষায়িত যানবাহন কেনার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ২ হাজার ২৮০ কোটি ১৪ লাখ ১৪ হাজার টাকা।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত প্রকল্প দুটি বাংলাদেশ পুলিশ ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্পের সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করবে সরকার।
গত ৩০ মার্চ জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছিলেন, গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের অনেক গাড়ি পুড়ে যাওয়া ও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় টহল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পুলিশের সক্ষমতা পুনরুদ্ধার ও ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির পরিবর্তে নতুন যানবাহন সরবরাহে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, একটি থানার অধীনে সাধারণত একাধিক ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড থাকে। বিভিন্ন এলাকায় একযোগে টহল ও অভিযান পরিচালনার জন্য প্রতিটি থানায় অন্তত চার থেকে পাঁচটি পিকআপ বা টহল গাড়ি প্রয়োজন। জনবহুল ও অপরাধপ্রবণ এলাকায় এর চেয়েও বেশি যানবাহন দরকার হতে পারে। কিন্তু অনেক থানায় মাত্র এক বা দুটি গাড়ি থাকায় এক এলাকায় অভিযান চালালে অন্য এলাকায় পর্যাপ্ত টহল ও জরুরি সহায়তা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) কামারুম মুনিরা জানান, মূলত পরিবহন সংকট দূর করা এবং পুলিশের কার্যক্রম গতিশীল করার উদ্দেশ্যেই যানবাহন কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয়তা পুনর্মূল্যায়ন করে আরও গাড়ির জন্য আবেদন করা হতে পারে।
তিনি জানান, নিয়মিত টহল, অপরাধ ও মাদকবিরোধী অভিযান, গ্রেপ্তার এবং জরুরি সেবা প্রদানে পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোই অপারেশনাল যানবাহন প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। জাতীয় নির্বাচন ও বড় ধরনের আয়োজনের সময় দেশজুড়ে পুলিশের একযোগে দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনীয়তাও প্রকল্প প্রস্তাবে গুরুত্ব পেয়েছে।
অন্যদিকে, বিশেষায়িত যানবাহন প্রকল্পের আওতায় সংঘাত নিয়ন্ত্রণ, অপরাধ তদন্ত এবং দুর্গম এলাকায় অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রকল্পে রায়ট কার, অল-টেরেইন ভেহিকেল, মোবাইল কমান্ড সেন্টার, ক্রাইম সিন ভ্যান ও জলযানের মতো যানবাহন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
রায়ট কার জনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দিতে সহায়তা করবে। সাধারণ টহল গাড়ি চলাচলে অক্ষম এমন দুর্গম এলাকায় অভিযান পরিচালনায় কাজে আসবে অল-টেরেইন ভেহিকেল। মোবাইল কমান্ড সেন্টার অস্থায়ী নিয়ন্ত্রণকক্ষ হিসেবে কাজ করবে। অন্যদিকে, ক্রাইম সিন ভ্যান অপরাধস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ ও তদন্ত কার্যক্রমে সহায়তা করবে। নদীমাতৃক এলাকায় টহল, উদ্ধার অভিযান এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় জলযান ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
নথিপত্রে দেশের ৬৩৯টি প্রশাসনিক থানার পাশাপাশি ২৪টি রেলওয়ে থানা ও ৭৩টি হাইওয়ে থানার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
অপারেশনাল যানবাহন প্রকল্পে গাড়ি মেরামতের সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি ৬৫০ জন হালকা যানবাহন চালক, ৩০০ জন ভারী যানবাহন চালক এবং ৫০ জন মেকানিককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষায়িত যানবাহন প্রকল্পের আওতায় আরও ৯১০ জনকে ড্রাইভিং ও মেকানিক্যাল প্রশিক্ষণ এবং ৫০ জনকে মেকানিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
গত ১৫ অক্টোবর পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি প্রস্তাব দুটি পর্যালোচনা করে। কমিটি প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলনে যথাযথতা নিশ্চিত করা, সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ এবং যানবাহনের পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা রাখার সুপারিশ করেছে।