আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। শতাধিক ব্যক্তিকে গুম ও হত্যার অভিযোগে করা এ মামলায় এখন তদন্ত কর্মকর্তাকে আসামিপক্ষের জেরা এবং পরে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পালা। এসব ধাপ শেষ হলে মামলাটি রায়ের জন্য প্রস্তুত হবে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) মামলার শুনানিতে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন জিয়াউল আহসান। তিনি অভিযোগ করেন, কারাগার থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনা-নেওয়ার সময় তাকে একটি প্রিজন ভ্যানে একাই পরিবহন করা হচ্ছে। এতে পথে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিয়ে তার দায় তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
এ কারণে অন্য আসামিদের সঙ্গে তাকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে আনা-নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তাঝুঁকি এড়াতে কারাগারে রেখেই অডিও-ভিজ্যুয়াল কনফারেন্সের মাধ্যমে মামলার কার্যক্রমে তাকে যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে প্রসিকিউশন। বিষয়টি নিয়ে উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর ট্রাইব্যুনাল আদেশের জন্য রেখেছেন।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আসামি নিজেই যখন নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন, তখন তাকে সশরীরে ট্রাইব্যুনালে আনা-নেওয়ার পরিবর্তে ভার্চুয়ালি হাজির করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। করোনাকালে প্রণীত আইনে সাক্ষী ও আসামিকে অডিও-ভিজ্যুয়াল পদ্ধতিতে আদালতের কার্যক্রমে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে বলেও জানানো হয়।
শুনানি শেষে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম বলেন, জিয়াউল আহসান লিখিত আবেদনের পাশাপাশি ট্রাইব্যুনালেও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তিনি কেন এমন আশঙ্কা করছেন, তা তারাই ভালো জানেন। তবে তার বক্তব্য বিবেচনায় নিয়ে সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে ভার্চুয়াল হাজিরার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রসিকিউশনের দাবি, ২০০৯ সালের পর তৎকালীন সরকার ক্ষমতা ধরে রাখতে ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে ‘সিস্টেমেটিক ক্রাইম’-এর অংশ হিসেবে জোরপূর্বক গুম, অপহরণ ও হত্যার কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা বা লেখার কারণে গুম, ক্রসফায়ারের নামে হত্যা এবং মিথ্যা মামলায় কারাগারে পাঠানোর অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে বলে ট্রাইব্যুনালে দাবি করা হয়।
প্রসিকিউটর তামিমের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কর্মকাণ্ডে জিয়াউল আহসান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন বলে তদন্তে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০০৯ সালের পর তিনি সেনাবাহিনী থেকে বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় প্রেষণে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি), স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) এবং র্যাবে দায়িত্ব পালন করেন।
র্যাবে দায়িত্ব পালনের সময় জিয়াউল আহসান গোয়েন্দা শাখার পরিচালক এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) ছিলেন। এসব পদে থাকার সময় বেআইনিভাবে আটক, গুম ও হত্যার ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা তদন্তে পাওয়া গেছে বলে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। কয়েকজনকে হত্যার পর মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়ার অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে বলে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যে বলা হয়।
প্রসিকিউটর তামিমের দাবি, ১৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যের মাধ্যমে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। এখন তদন্ত কর্মকর্তাকে আসামিপক্ষের জেরা শেষ হলে মামলাটি যুক্তিতর্কের পর্যায়ে যাবে। এরপর রায়ের জন্য মামলাটি প্রস্তুত হবে।
উল্লেখ্য, জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১১ সালে গাজীপুরের পুবাইলে তিনজনকে হত্যার অভিযোগ, ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে বরগুনার পাথরঘাটার চরদুয়ানী খালসংলগ্ন বলেশ্বর নদীর মোহনায় প্রায় ৫০ জনকে হত্যার অভিযোগ এবং একই সময়ে বলেশ্বর নদী ও বাগেরহাটের শরণখোলায় সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় অভিযানের আড়ালে আরও প্রায় ৫০ জনকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ তিনি অস্বীকার করে আসছেন।