বিশেষ প্রতিবেদনঃ
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক ভিত আরও শক্তিশালী করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। একই সঙ্গে স্থানীয় নির্বাচনে দলের ভেতরে বিভক্তি ও শৃঙ্খলাভঙ্গ এড়াতে ‘একক প্রার্থী’ নিশ্চিত করার কৌশল নিয়েছে দলটির হাইকমান্ড। এ লক্ষ্যে দেশজুড়ে বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি বিলুপ্ত করে দ্রুত নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পর জাতীয় পর্যায়ের সম্মেলনের প্রস্তুতিও নিচ্ছে বিএনপি। এর আগে দলকে সাংগঠনিকভাবে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করতে শতভাগ ইতিবাচক পুনর্বিন্যাসের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গত ১১ জুলাই দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তিনি দায়িত্বশীল নেতাদের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। ইতোমধ্যে দল গোছানোর অংশ হিসেবে কেন্দ্র থেকে কুমিল্লা মহানগর বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি এবং কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির আংশিক কমিটি অনুমোদন করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে নতুন নেতৃত্ব গঠনের কাজও শুরু হয়েছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মতে, তৃণমূলকে শক্তিশালী না করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক কর্মসূচি ও আন্দোলন-সংগ্রামে দলকে আরও সুসংগঠিত রাখতে এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার কোনো বিকল্প নেই।
এ ধারাবাহিকতায় শনিবার রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে রংপুর বিভাগের তিন জেলার নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তারেক রহমান। বৈঠকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এবং সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলু উপস্থিত ছিলেন। পঞ্চগড়, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও জেলার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট উপজেলা, থানা ও পৌরসভা পর্যায়ের শীর্ষ নেতারাও এতে অংশ নেন। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য জেলার নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন বিএনপি চেয়ারম্যান।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং সাংগঠনিক পুনর্গঠন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেন তারেক রহমান। এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া সম্পূর্ণ নির্দলীয় ও প্রভাবমুক্ত পরিবেশে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে প্রতীক না থাকলেও দলীয় সমর্থনের প্রশ্নে যাতে কোনো বিভেদ তৈরি না হয়, সে বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বিএনপি। গত জাতীয় নির্বাচনে অর্ধশতাধিক আসনে দলের নেতাদের বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার স্থানীয় নির্বাচনে আগেভাগেই সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। তারেক রহমান নেতাদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, দলীয় প্রতীক না থাকলেও প্রার্থীর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে হবে সামষ্টিক এবং একক প্রার্থীর পক্ষে সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
একই সঙ্গে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত ঝুলে থাকা সাংগঠনিক প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে বিতর্কিত ব্যক্তি বা অন্য দল থেকে অনুপ্রবেশকারীদের ঠাঁই না দেওয়ার পাশাপাশি তরুণ, সক্রিয় ও ত্যাগী নেতাদের নেতৃত্বে আনার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, এটি মূলত একটি সাংগঠনিক আলোচনা সভা ছিল। জাতীয় নির্বাচনের পর এটিই আমাদের প্রথম সভা হওয়ায় বিভিন্ন উপজেলা ও পৌরসভার নেতারা অংশ নিয়েছেন।
মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয়ভাবে অংশগ্রহণ করা হবে না এবং কোনো দলীয় প্রতীকও থাকবে না। তবে স্থানীয়ভাবে একক প্রার্থী নির্ধারণ করা সম্ভব হলে দলগতভাবে তাকে সমর্থন দেওয়ার চেষ্টা থাকবে। ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমিন বলেন, সংগঠনের বর্তমান অবস্থা এবং বিভিন্ন এলাকার সমস্যা সম্পর্কে দলের প্রধান খোঁজখবর নিয়েছেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দলের করণীয় এবং সংগঠনকে গতিশীল করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
দিনাজপুর জেলা বিএনপির এক নেতা জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তৃণমূল থেকেই প্রার্থী নির্বাচন করা হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে কেন্দ্র থেকে কোনো চাপ সৃষ্টি করা হবে না। স্থানীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়েই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির এ সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও একক প্রার্থী কৌশল আগামী দিনের নির্বাচনি রাজনীতিতে দলটির জন্য কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।