চলতি বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বেলজিয়ামের পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হেলজেন। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সুইডেনের স্টকহোমে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটের দিকে বিজয়ীর নাম ঘোষণা করে।
আইসকিউব নিউট্রিনো পর্যবেক্ষণে অসামান্য অবদান এবং মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য তাকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
দক্ষিণ মেরুর বরফ ব্যবহার করে নিউট্রিনো কণার সন্ধান করা সম্ভব—এই ধারণা প্রথম দেন হেলজেন। তার ধারণার ওপর ভিত্তি করেই ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি’ নির্মাণের পথ তৈরি হয়। প্রায় এক ঘনকিলোমিটার আয়তনের বরফজুড়ে স্থাপিত এই বিশাল গবেষণাগারটি আলোকসংবেদী সেন্সরে সজ্জিত। এর মাধ্যমে গবেষকেরা মহাবিশ্বের দূরবর্তী ও অত্যন্ত শক্তিশালী বিভিন্ন উৎস থেকে আসা নিউট্রিনো শনাক্ত করছেন।
নিউট্রিনো অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও দুর্বলভাবে ক্রিয়াশীল কণা। এটি প্রায় অবাধে মহাবিশ্ব ও আমাদের শরীরের মধ্য দিয়ে চলে যেতে পারে। খুবই বিরল ক্ষেত্রে কোনো নিউট্রিনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। তখন উপযুক্ত যন্ত্রের মাধ্যমে সেই সংঘর্ষ শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
নিউট্রিনোর বিশেষত্ব হলো, অন্য অনেক কণার তুলনায় এটি মহাকাশে চলার সময় সহজে দিক পরিবর্তন করে না বা উল্লেখযোগ্য শক্তি হারায় না। ফলে মহাজাগতিক উৎস থেকে সরাসরি পৃথিবীতে পৌঁছানো নিউট্রিনো মহাবিশ্বের অত্যন্ত দূরবর্তী ও শক্তিশালী প্রক্রিয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।
১৯৮৮ সালে দক্ষিণ মেরুতে বরফ ব্যবহার করে নিউট্রিনো শনাক্ত করার ধারণা দেন হেলজেন। নিউট্রিনো কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হলে আলোর ঝলকানি তৈরি হতে পারে। দক্ষিণ মেরুর স্বচ্ছ বরফের মধ্যে স্থাপন করা সেন্সরের মাধ্যমে সেই আলো শনাক্ত ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব।
দক্ষিণ মেরুর বরফ এ ধরনের গবেষণার জন্য বেশ উপযোগী। বাইরের বিভিন্ন প্রভাব থেকে তুলনামূলকভাবে বিচ্ছিন্ন, স্থিতিশীল পরিবেশ এবং ভূমিকম্পের ঝুঁকি না থাকায় সেখানে বিশাল পরিসরে সেন্সর স্থাপনের ধারণাটি গবেষকদের সমর্থন পায়। পরবর্তী সময়ে সেখানে প্রাথমিক পরীক্ষা শুরু হয়।
উচ্চশক্তির মহাজাগতিক নিউট্রিনো অত্যন্ত বিরল। তাই এগুলোর সংঘর্ষ শনাক্ত করতে বিপুল পরিমাণ বরফের প্রয়োজন হয়। প্রায় এক ঘনকিলোমিটার বরফজুড়ে বিস্তৃত ‘আইসকিউব’ গবেষণাগারের নির্মাণকাজ ২০১১ সালে শেষ হয়।
এরপর বিজ্ঞানীরা উচ্চশক্তির নিউট্রিনোর সন্ধান পেতে শুরু করেন। কয়েক বছর পর তারা সৌরজগতের অনেক দূরের মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা নিউট্রিনো শনাক্ত করার কথাও জানান। এর মাধ্যমে মহাবিশ্বে নিউট্রিনোর উৎস অনুসন্ধানের নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়।
আইসকিউবের মাধ্যমে নিয়মিত সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এখন বোঝার চেষ্টা করছেন, মহাবিশ্বের অত্যন্ত শক্তিশালী বিভিন্ন উৎসে কীভাবে উচ্চশক্তির নিউট্রিনো তৈরি হয়। এসব গবেষণা মহাবিশ্বের অনেক অজানা তথ্য উন্মোচনে সহায়ক হতে পারে।
গত বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জন ক্লার্ক, মিশেল এইচ ডেভোরেট ও জন এম মার্টিনিস। বৈদ্যুতিক বর্তনীতে স্থূল কোয়ান্টাম যান্ত্রিক টানেলিং ও শক্তির কোয়ান্টাইজেশন আবিষ্কারের জন্য তারা এ পুরস্কার পান।
১৯০১ সাল থেকে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত ১১৯ বার এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। মাত্র ২৫ বছর বয়সে সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছিলেন লরেন্স ব্র্যাগ। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি বয়সে এ পুরস্কার পান আর্থার আসকিন; ৯৬ বছর বয়সে ২০১৮ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।