আজকের তারিখঃ 27 অক্টোবর, 2026 সময়ঃ 6:00
লগইন
9+
অনলাইন সংস্করণ 6 মিনিটে পড়ুন ARTICLE

দ্বিমুখী চাপে মোদি সরকার, রাজ্যে কি হারাতে যাচ্ছে মোদি !

Front line Bangladesh 27 Jul, 2026 • 08:55 PM
ছবির ক্যাপশন: দ্বিমুখী চাপে মোদি সরকার, রাজ্যে কি হারাতে যাচ্ছে মোদি !
আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ 

ভারতের রাজধানী দিল্লি এখন দুই ভিন্নধর্মী গণআন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। একদিকে ভারত-মার্কিন প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তির বিরোধিতায় কৃষকদের ‘দিল্লি চলো’ কর্মসূচি, অন্যদিকে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নিট (এনইইটি) প্রশ্নফাঁস এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির দাবিতে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)’-এর আন্দোলন। দুটি আন্দোলনের মূল বিষয় আলাদা হলেও একটি জায়গায় তারা একসূত্রে গাঁথা, কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ। 

ফলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার বর্তমানে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক, তিন দিক থেকেই নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
প্রস্তাবিত ভারত-মার্কিন বহুমাত্রিক বাণিজ্য চুক্তির প্রতিবাদে আয়োজিত ‘কিষাণ মহাপঞ্চায়েতে’ যোগ দিতে পাঞ্জাব থেকে দিল্লির উদ্দেশ্যে যাত্রা করা শত শত কৃষককে পাঞ্জাব-হরিয়ানা সীমান্তের শম্ভু এলাকায় আটকে দিয়েছে হরিয়ানা পুলিশ। মঙ্গলবার যাত্রা শুরু করা কৃষকদের দিল্লিতে প্রবেশ করতে না দেওয়ায় তারা সীমান্ত এলাকাতেই অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছেন। 

কৃষক নেতারা অভিযোগ করেছেন, তাদের শান্তিপূর্ণভাবে রাজধানীতে গিয়ে মত প্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। বিকেইউ (শহীদ ভগৎ সিং) নেতা তেজবীর সিং দাবি করেন, হরিয়ানা পুলিশ অন্যায়ভাবে পাঞ্জাবের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে ব্যারিকেড স্থাপন করেছে এবং পাঞ্জাব সরকারও এ বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
যদিও পাঞ্জাবের কৃষকদের দিল্লিতে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে, হরিয়ানার আম্বালা, কুরুক্ষেত্র ও আশপাশের এলাকার কৃষকেরা দিল্লিমুখী কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন। কৃষকদের এই আন্দোলনে পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও হিমাচল প্রদেশের একাধিক সংগঠন ‘দেশ বাঁচাও মোর্চা’র ব্যানারে একাত্মতা ঘোষণা করেছে। 

কৃষক সংগঠনগুলোর দাবি, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তি কেবল একটি অর্থনৈতিক চুক্তি নয়; বরং এটি ভারতের কৃষি, দুগ্ধশিল্প, শিল্পখাত, ডিজিটাল বাণিজ্য, ই-কমার্স, মেধাস্বত্ব এবং পরিষেবা খাতের ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। তাদের আশঙ্কা, চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ভারতীয় কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়বে। কিষাণ মজদুর সংঘর্ষ কমিটির নেতা সারওয়ান সিং পান্ধের জানিয়েছেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, ২০২৬ সালের শরৎকালেই দুই দেশের মধ্যে প্রথম ধাপের বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হবে। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এখন আলোচনা চলছে।

কৃষক নেতাদের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় বাজারে আমেরিকান সয়াবিন, ভুট্টা, আপেল, বাদাম, দুগ্ধজাত পণ্য এবং হাঁস-মুরগির মাংসের ওপর শুল্ক কমানোর জন্য চাপ দিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রে কৃষি ও দুগ্ধশিল্পে বিপুল পরিমাণ সরকারি ভর্তুকি দেওয়া হয়। ফলে সেসব পণ্য ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করলে ভারতীয় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবেন না। বিশেষ করে ভারতের দুগ্ধ খাতকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্দোলনকারীরা। 

কারণ দেশটির প্রায় আট কোটি গ্রামীণ পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। কৃষক নেতাদের মতে, দুগ্ধশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব গোটা গ্রামীণ অর্থনীতি, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পেও পড়বে।
এ কারণে কৃষক সংগঠনগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তির সব নথিপত্র জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে কৃষক, শ্রমিক, দুগ্ধ উৎপাদক এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত গ্রহণ ছাড়া কোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর না করার আহ্বান জানিয়েছে তারা। 

অন্যদিকে রাজধানী দিল্লিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)’-এর আন্দোলন। নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন শিক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক জবাবদিহির দাবিতে একটি জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ভারতে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থী মাত্র এক লাখ ৩০ হাজার মেডিকেল আসনের জন্য প্রতিযোগিতা করে। অনেক পরিবার সন্তানের কোচিং ও প্রস্তুতির জন্য সঞ্চয় ভেঙে ফেলেন কিংবা ঋণগ্রস্ত হন। প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে বহু শিক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও বিক্রির ঘটনা ঘটলেও সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এই আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করে অনশনে অংশ নেন লাদাখের প্রকৌশলী ও শিক্ষা অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত তিনি অনশন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। 

পরবর্তীতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে আদালতের নির্দেশনায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তার পরিবার অভিযোগ করেছে, এটি ছিল এক ধরনের বেআইনি আটক। হাসপাতাল থেকেই সোনম ওয়াংচুক আন্দোলনকারীদের সংসদ অভিমুখে পদযাত্রার আহ্বান জানান। এরপর সোমবার সিজেপির ডাকে মধ্য দিল্লিতে হাজারো মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। আন্দোলনকারীদের মধ্যে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।


দিল্লি পুলিশ সংসদের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার অনুমতি না দিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড স্থাপন করে। কিছু এলাকায় সাময়িকভাবে ইন্টারনেট সেবাও সীমিত করা হয়। এরপরও দুপুরের আগেই ২০ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভস্থলে জড়ো হন।
সংসদমুখী পদযাত্রার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ বাধে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করেছে। এতে কয়েকজন আন্দোলনকারী এবং পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। 

সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস জানিয়েছেন, তাদের তিনটি প্রধান দাবি হলো সোনম ওয়াংচুককে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হবে এবং প্রশ্নফাঁসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ও আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এসব দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কৃষি ও শিক্ষার মতো দুই গুরুত্বপূর্ণ খাতকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনগুলো মোদি সরকারের জন্য কেবল প্রশাসনিক সংকট নয়, রাজনৈতিকভাবেও বড় চ্যালেঞ্জ। 

কারণ একদিকে দেশের কোটি কোটি কৃষকের জীবিকা ও গ্রামীণ অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ও শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, দিল্লির রাজপথে চলমান এই দুই আন্দোলন আগামী দিনে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে গণতান্ত্রিক অধিকার, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রশ্নে জনমত যেভাবে সংগঠিত হচ্ছে, তা মোদি সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছে। 

বর্তমানে সবার নজর কেন্দ্রীয় সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। কৃষক ও শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সরকার কীভাবে সাড়া দেয়, সেটিই নির্ধারণ করবে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ গতি-প্রকৃতি এবং দিল্লির রাজনৈতিক আবহ।
ট্যাগ
দ্বিমুখী চাপে মোদি সরকার রাজ্যে কি হারাতে যাচ্ছে মোদি !
মন্তব্য করুন
Front line Bangladesh
অনলাইন সংস্করণ • 27 Jul, 2026 • 08:55 PM
বিজ্ঞাপন (Compact)