চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে সাত দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের ইন্সপেক্টর মজিবুর রহমান গত বৃহস্পতিবার ঢাকার আদালতে এ আবেদন করেন।

রিমান্ড আবেদনে ডনকে ‘অত্যন্ত সুকৌশলী ও ধূর্ত প্রকৃতির লোক’ উল্লেখ করে সিআইডি বলেছে, আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর এই মামলার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকেও তার মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে আসা হচ্ছে।

প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই শাহ আলম জানান, আসামিকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদনের শুনানির জন্য আগামী ২৭ আগস্ট দিন ধার্য করেছেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা।

রিমান্ড আবেদনে সিআইডি তিনটি কারণ তুলে ধরেছে। সংস্থাটির দাবি, ১৯৯৬ সালে মামলা হওয়ার পর থেকেই সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী ছেলের মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছেন। মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হওয়ায় প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে ডনকে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, ডনকে ‘কৌশলী ও ধূর্ত’ উল্লেখ করে সিআইডি বলেছে, তাকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য সহযোগীদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তাদের অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি মামলার রহস্য উন্মোচনেও এ জিজ্ঞাসাবাদ সহায়ক হবে বলে মনে করছে তদন্ত সংস্থা।

তৃতীয়ত, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা থাকা অবস্থায় ডন কীভাবে ও কেন দেশের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন এবং কারও প্ররোচনা বা সহযোগিতা ছিল কি না, সে বিষয়েও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায় সিআইডি।

গত ৯ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। পরে তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই দিনই আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ১২ আগস্ট জামিনের আবেদন করা হলেও তা নামঞ্জুর হয়।

দীর্ঘদিনের রহস্য

সালমান শাহর প্রকৃত নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনের বাসায় তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর থেকেই এটি আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত হত্যা—তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলে আসছে।

প্রথমে সালমানের বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী অপমৃত্যুর মামলা করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে অপমৃত্যুর মামলাকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন। এরপর মামলাটির তদন্তভার যায় সিআইডির কাছে।

১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি তদন্ত প্রতিবেদন দিয়ে জানায়, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন। তবে এ প্রতিবেদন মেনে নেননি তার বাবা। পরে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে যায়। ২০১৪ সালে দেওয়া বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনেও হত্যার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।

পরবর্তীতে সালমানের মা নীলা চৌধুরী ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় পুনঃতদন্তের দাবি জানান। মামলাটির তদন্তভার একপর্যায়ে র‌্যাব এবং পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে যায়।

প্রায় চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। সেখানে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন বলে উল্লেখ করা হয় এবং হত্যার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়। নীলা চৌধুরী ওই প্রতিবেদনও প্রত্যাখ্যান করেন।

২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট পিবিআইয়ের প্রতিবেদন আমলে নিয়ে মামলার আসামিদের অব্যাহতি দেন। পরে এর বিরুদ্ধে রিভিশন আবেদন করা হয়।

সবশেষ গত বছরের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক নীলা চৌধুরীর রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদের আগের অভিযোগ এবং ঘটনায় জড়িত রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দি যুক্ত করে হত্যা মামলা দায়েরের নির্দেশ দেওয়া হয়।

নতুন করে দায়ের করা এই হত্যা মামলার তদন্তের ধারাবাহিকতায় অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখন তার সাত দিনের রিমান্ড আবেদনের শুনানি হবে ২৭ আগস্ট। সিআইডির দাবি, ডনকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় নতুন কোনো তথ্য বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।