পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পিটিআই প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানকে ইসলামাবাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের বিরুদ্ধে পুনর্বিবেচনার আবেদন করেছে দেশটির সরকার।
বুধবার (১৯ আগস্ট) সুপ্রিম কোর্টে আবেদনটি করেন ইসলামাবাদের অ্যাডভোকেট জেনারেল নাভিদ হায়াত মালিক। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম দ্য ডনের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
সরকারের দাবি, ইমরান খানকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ দেওয়ার অন্তর্বর্তী আদেশটি ‘বৈষম্যমূলক’। একই সঙ্গে আদালত তার এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে এই নির্দেশ দিয়েছেন বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট ইমরান খানকে দুই দিনের মধ্যে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দেন। সেখানে বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ডের মাধ্যমে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা করার কথা বলা হয়।
সরকারের আবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের ১৯৭৮ সালের কারাবিধিতে বন্দিদের হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। সাধারণ ক্ষেত্রে সরকারের অনুমোদন নিয়ে কারা কর্তৃপক্ষকে বন্দিকে হাসপাতালে পাঠাতে হয়। জরুরি পরিস্থিতিতে কারাগারের সুপারিনটেনডেন্ট ব্যবস্থা নিতে পারেন এবং পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তা জানাতে হয়।
সরকারের দাবি, সুপ্রিম কোর্টের আদেশে কারাবিধির ১৯৭ নম্বর নিয়মটি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। আদালত ওই নিয়ম বিবেচনা করলে এমন আদেশ দিতেন না বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাকিস্তান সরকার আরও বলেছে, একজন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিকে ব্যক্তিগত পছন্দের বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হলে কারাগারের বিচার ও ব্যবস্থাপনা কাঠামোয় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
আবেদনে সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারের ভাষ্য, সংবিধান অনুযায়ী সব নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। কিন্তু ইমরান খানকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলে একই অবস্থায় থাকা অন্য বন্দিরাও একই সুবিধা দাবি করতে পারেন। এতে বন্দিদের মধ্যে বৈষম্য ও বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠতে পারে।
এ ছাড়া ইমরানকে হাসপাতালে নেওয়ার আবেদনে ইসলামাবাদের জেলা নির্বাচন কমিশনারকে বিবাদী করা হলেও শুনানির আগে তাকে কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেছে সরকার। তাদের মতে, এটি ন্যায়বিচারের স্বাভাবিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সরকার আরও দাবি করেছে, মামলাটি প্রথমবার শুনানিতে ওঠার সময় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নোটিশ দেওয়া হয়নি। অথচ অন্তর্বর্তী আদেশের মাধ্যমে ইমরানকে হাসপাতালে নেওয়া, ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের যুক্ত করা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার মতো প্রায় সব দাবিই মেনে নেওয়া হয়েছে।
সরকারের যুক্তি, অন্তর্বর্তী পর্যায়ে আদালত এমন কোনো চূড়ান্ত সুবিধা দিতে পারেন না, যার ফলে মূল মামলায় কার্যত আর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকে না।
এদিকে ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের আগে আদিয়ালা কারাগার কর্তৃপক্ষ একটি প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে বলা হয়, কারাগারে তাকে নিয়মিত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং চিকিৎসকরা দিনে তিনবার তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছেন।
তবে সংযুক্ত নথিতে বলা হয়েছে, গত ১ আগস্ট চিকিৎসকরা ইমরানের অনিয়ন্ত্রিত ও ওঠানামা করা রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, মাথাব্যথা ও অস্থিরতার কথা উল্লেখ করেন। পরে ১০ আগস্ট একটি মেডিকেল বোর্ডও তাকে পরীক্ষা করে। বোর্ড তাকে নিয়মিত হাঁটা, মানসিক চাপ কমানো এবং পরিবারের সঙ্গে আরও ঘন ঘন যোগাযোগের পরামর্শ দেয়।
সরকারের দাবি, ইমরানকে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার আগে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া উচিত ছিল। আদালত চিকিৎসাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ নয় বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে যা ছিল
মঙ্গলবারের অন্তর্বর্তী আদেশে সুপ্রিম কোর্ট ইমরান খানকে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বোনকে চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত থাকার অনুমতি দেন।
এ ছাড়া ইমরানের পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের ব্যবস্থা করতে বলা হয়। পরিবারকে সপ্তাহে একবার তার সঙ্গে দেখা এবং ছেলেদের সঙ্গে সপ্তাহে দুবার ফোনে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ইমরান গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে তার সব চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি আদালতে জমা দিতে সরকারকেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর মামলাটির পরবর্তী শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। ততদিন আদালতের নির্দেশ মেনে চলতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে।
ইমরানের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বা চিকিৎসা প্রতিবেদন রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার না করার নির্দেশও দিয়েছে আদালত। পাশাপাশি হাসপাতাল প্রাঙ্গণে পিটিআই, ইমরানের পরিবার বা সমর্থকদের কোনো সমাবেশ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে সরকারের আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার জানিয়েছিলেন, ইমরানকে বেসরকারি হাসপাতালের পরিবর্তে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের কাছে আদেশ পরিবর্তনের অনুরোধ জানাবে সরকার।
সরকারের করা পুনর্বিবেচনার আবেদনটি এখনো শুনানির জন্য নির্ধারিত হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের নিয়ম অনুযায়ী, একই রায় দেওয়া তিন বিচারপতির বেঞ্চই সাধারণত এ আবেদন শুনবে।
সূত্র: দ্য ডন