মোঃ শাহজাহান বাশার,সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার: দক্ষিণগ্রাম পদ্মবিলের সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো এর দুর্লভ হলুদ পদ্ম। স্থানীয়ভাবে পরিচিত এই হলুদ পদ্ম শুধু দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করছে না, গবেষকদেরও আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
পদ্মবিলের গুরুত্ব বিবেচনায় ২০২১ সালে এর সার্বিক সংরক্ষণে ইউনেসকোর সহযোগিতার উদ্যোগের কথা জানা যায়। সে সময় বিলের প্রবেশপথসহ বিভিন্ন স্থানে সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড স্থাপন, হলুদ পদ্মের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে লাল পতাকা টানানো এবং পাহারাদারের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিতভাবে পদ্মবিলকে সংরক্ষণ করা গেলে এটি বুড়িচং তথা কুমিল্লার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। তবে পর্যটন বিকাশের পাশাপাশি জলাভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ, পদ্মের প্রাকৃতিক বিস্তার এবং পাখির আবাসস্থল রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি রয়েছে।
বর্ষার জলে যখন চারপাশ থইথই, তখন কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার দক্ষিণগ্রামে যেন প্রকৃতি নিজের হাতে এঁকে দেয় এক বিস্ময়কর জলরঙের ছবি। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের পূর্ব পাশে প্রায় ২৫ একরজুড়ে বিস্তৃত পদ্মবিলটি বর্ষা মৌসুমে রূপ নেয় রঙিন জলাভূমিতে। লাল, সাদা, নীল ও দুর্লভ হলুদ পদ্মের সমারোহে বদলে যায় পুরো বিলের চেহারা। প্রকৃতির এই অপরূপ আয়োজন দেখতে ছুটে আসছেন দূর-দূরান্তের মানুষ।
রাজাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণগ্রামের এই পদ্মবিল এখন শুধু স্থানীয় সৌন্দর্যের নিদর্শন নয়; অল্প সময়ের মধ্যেই এর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, এমনকি বিদেশেও। বর্ষার মৌসুমে বিলের পানিতে ফুটে থাকা অসংখ্য পদ্ম-শাপলা, পানির ওপর ভেসে থাকা পাতা আর চারপাশের সবুজ প্রকৃতি দর্শনার্থীদের জন্য তৈরি করে এক অনন্য পরিবেশ।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিলের পানিতে নানা রঙের পদ্মের পাশাপাশি শাপলাও ফুটে রয়েছে। জলাভূমির আশপাশে দেখা মিলছে ডাহুক, সারস, বালিহাঁসসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির। কেউ নৌকায়, কেউ বিলের পাড়ে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। অনেকে আবার মোবাইল ফোনে ধারণ করছেন পদ্মবিলের ছবি ও ভিডিও।
তবে এই সৌন্দর্যের ভেতরেই রয়েছে সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ। দর্শনার্থীদের একটি অংশ পদ্মফুল ছিঁড়ে নেওয়া, গাছের ক্ষতি করা এবং অসচেতনভাবে বিলের পরিবেশ নষ্ট করার কারণে প্রাকৃতিক ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কুমিল্লা জজকোর্টের এপিপি অ্যাডভোকেট আরিফুর রহমান শ্রাবণ বলেন, “পদ্মবিলের সৌন্দর্য দেখতে মানুষ আসবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ফুল ছিঁড়ে নেওয়া বা গাছ নষ্ট করার প্রবণতা বন্ধ করতে না পারলে এই সৌন্দর্য বেশিদিন টিকবে না। দর্শনার্থীদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে।”
বিলের হলুদ পদ্মের মূল, কাণ্ড, শাখা ও ফুল গবেষণার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগসহ যুক্তরাষ্ট্রেও পাঠানোর তথ্য রয়েছে। ফলে একটি স্থানীয় জলাভূমির পদ্ম ধীরে ধীরে বৈজ্ঞানিক গবেষণার আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে এসব উদ্যোগের অনেকটাই শিথিল হয়ে পড়ে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ফলে দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে সংরক্ষণব্যবস্থা শক্তিশালী হয়নি।
বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক তানভীর হোসেন বলেন, “দক্ষিণগ্রাম পদ্মবিল একটি প্রাকৃতিক সম্পদ। ফুল ছেঁড়াসহ যেকোনো অনিয়ম রোধে এরই মধ্যে নিয়মিত নজরদারি শুরু করেছি।”
প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে গড়ে ওঠা এই পদ্মবিলের সৌন্দর্য ধরে রাখতে এখন সবচেয়ে জরুরি স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের সমন্বিত উদ্যোগ। কারণ দক্ষিণগ্রামের পদ্মবিল কেবল একটি দর্শনীয় স্থান নয়—এটি একটি জীবন্ত জলাভূমি, যেখানে পদ্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাখি, জলজ উদ্ভিদ, স্থানীয় জীববৈচিত্র্য এবং একটি এলাকার প্রাকৃতিক পরিচয়।
আজকের অসচেতনতা যদি আগামী দিনের পদ্মবিলকে বিবর্ণ করে দেয়, তবে হারিয়ে যাবে শুধু ফুল নয়—হারিয়ে যাবে কুমিল্লার এক অনন্য প্রাকৃতিক ঐতিহ্যও।