ইরানের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য হত্যাচেষ্টার হুমকির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তুরস্ক থেকে গোপনে একটি সামরিক বিমানে করে যুক্তরাজ্যে নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ও দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মাসে ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় গিয়েছিলেন ট্রাম্প। সম্মেলন শেষে প্রকাশ্যে তাকে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে উঠতে দেখা গেলেও সেটি ছিল নিরাপত্তা কৌশলের অংশ।
এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে ট্রাম্প পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠেন। কয়েক মিনিট পর বিমানবন্দরে খাবার ও অন্যান্য সরঞ্জাম পরিবহনে ব্যবহৃত একটি ক্যাটারিং কনটেইনারের আড়ালে তাকে অন্য একটি ছোট বিমানে স্থানান্তর করা হয়।
নিউইয়র্ক টাইমসও এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে একই ধরনের তথ্য প্রকাশ করেছে। সংবাদমাধ্যম দুটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের প্রকৃত অবস্থান সাংবাদিকদের পাশাপাশি হোয়াইট হাউসের কিছু কর্মকর্তার কাছ থেকেও গোপন রাখা হয়েছিল।
এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে একটি বিশ্বাসযোগ্য হুমকি পাওয়ার পর এই বিভ্রান্তিমূলক নিরাপত্তা অভিযান পরিচালনা করা হয়।
এর আগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, ৮ জুলাই ট্রাম্প পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে করে তুরস্ক ত্যাগ করেন। ট্রাম্প নিজেও তার ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে জানিয়েছিলেন, কাতারের উপহার দেওয়া নতুন বোয়িং ৭৪৭-৮ বিমানের পরিবর্তে পুরোনো আকাশি-নীল এয়ার ফোর্স ওয়ানে করে তিনি ব্রিটেনের রয়্যাল এয়ার ফোর্স মাইল্ডেনহল ঘাঁটিতে যাবেন।
ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে তুরস্ক সফর ছিল কাতারের উপহার দেওয়া নতুন বিমানটির প্রথম আন্তর্জাতিক সফর। বিমানটির দ্রুত সংস্কার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে এর আগে ব্যয় ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
আঙ্কারা ছাড়ার আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘পুরোনো দিনের কথা মনে করে’ তিনি পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান ব্যবহার করবেন। একই সময়ে নতুন বিমানটিও মাইল্ডেনহল ঘাঁটিতে পাঠানো হবে, যাতে সেখানে থাকা মার্কিন সেনারা সেটি ঘুরে দেখতে পারেন।
তবে ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠার পর ট্রাম্পকে গোপনে একটি সি-৩২এ সামরিক বিমানে স্থানান্তর করা হয়। পরে ওই বিমানেই তাকে যুক্তরাজ্যে নিয়ে যাওয়া হয়।
এ সময় ট্রাম্পের সঙ্গে থাকা সাংবাদিকদের প্রেস কেবিনের জানালার পর্দা বন্ধ রাখতে বলা হয়েছিল। এমনকি হোয়াইট হাউসের কিছু কর্মীও ধারণা করেছিলেন, প্রেসিডেন্ট পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানেই রয়েছেন।
জানালার পর্দা বন্ধ রাখার কারণ জানতে চাইলে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, তারা সম্ভবত একটি বিপজ্জনক ফ্লাইটে ছিলেন। এরপর তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘কিন্তু আমি গেলে তোমরাও যাবে, তাই তো?’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পকে বহনকারী সি-৩২এ স্থানীয় সময় রাত ১০টা ২০ মিনিটের দিকে ব্রিটেনে পৌঁছায়। এর কয়েক মিনিট পর পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান ও সাংবাদিকদের বহনকারী বিমানটি সেখানে অবতরণ করে।
নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, তৃতীয় একটি বিমান থেকে গাড়িতে করে ট্রাম্পকে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানের কাছে নেওয়া হয়। এরপর ভিন্ন একটি প্রবেশপথ দিয়ে তাকে বিমানে তোলা হয়। পরে বিমানের ওপরের বাম পাশের দরজা দিয়ে তাকে নামতে দেখা যায়।
ট্রাম্পের সঙ্গে থাকা সাংবাদিকরা জানান, স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৫৬ মিনিটে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে নেমে ট্রাম্প সাংবাদিকদের দিকে বিজয়চিহ্ন দেখান। তবে তাদের সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে যাননি। পরে তিনি সেখানে থাকা মার্কিন সেনাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং কাতারের দেওয়া নতুন বিমানের দিকে যান।
রাষ্ট্রপ্রধানের নিরাপত্তায় এ ধরনের বিভ্রান্তিমূলক কৌশল অতীতেও ব্যবহৃত হয়েছে। ২০০০ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন পাকিস্তান সফরের সময় একটি অচিহ্নিত নির্বাহী বিমানে পাকিস্তানে প্রবেশ করেছিলেন। সে সময় তার আনুষ্ঠানিক এয়ার ফোর্স ওয়ানকে বিভ্রান্তিমূলক বিমান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
গোপন তৃতীয় বিমানে ট্রাম্পের যাত্রা সম্পর্কে জানতে চাইলে হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভ চেউং কাতারের দেওয়া নতুন বিমানটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে একটি বিবৃতি দেন।
তিনি বলেন, বিমানটিতে প্রেসিডেন্ট ও তার কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বহু শত্রু প্রেসিডেন্টকে লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা করছে এবং এসব হুমকি মোকাবিলায় প্রশাসন তাদের হাতে থাকা সব ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহার করছে।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস