ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যুদ্ধ পরিচালনা, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতা এবং সরকারের বিভিন্ন নীতি নিয়ে জনঅসন্তোষের মধ্যে নির্বাচনে তার দল লিকুদের আসন কমার আভাস পাওয়া গেছে। তবে জোট গঠনের মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে।
ইসরায়েলের রাজনীতিতে এবারের নির্বাচন নেতানিয়াহুর ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২২ সালের নির্বাচনের পর থেকে তার প্রতি জনসমর্থন কমেছে বলে বিভিন্ন জনমত জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। গাজা, লেবানন ও ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং সরকারের অভ্যন্তরীণ নীতি নিয়ে বিতর্ক তার রাজনৈতিক অবস্থানকে চাপে ফেলেছে।
ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক ও হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গিডিওন রাহাতের মতে, নেতানিয়াহুর সমর্থনের অন্যতম ভিত্তি হলো অতি-রক্ষণশীল ইহুদি গোষ্ঠী, কট্টর ডানপন্থি এবং তার ব্যক্তিগত সমর্থকেরা। পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন নীতি এসব গোষ্ঠীর সমর্থন ধরে রাখতে ভূমিকা রেখেছে।
রাহাতের মতে, ইসরায়েলের রাজনীতিতে পরিচয়ভিত্তিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় যুদ্ধের সাফল্য বা ব্যর্থতা সব সময় ভোটারদের সিদ্ধান্তে নির্ধারক ভূমিকা রাখে না। নেতানিয়াহুর সমর্থকদের একাংশ মনে করেন, দেশটির প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলো তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এবং ৭ অক্টোবরের হামলার ব্যর্থতার জন্য এককভাবে তাকে দায়ী করা যায় না।
অন্যদিকে, গত চার বছরে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ বেড়েছে। বিচারব্যবস্থায় সংস্কারের উদ্যোগকে অনেকে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছেন। অতি-রক্ষণশীলদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগের প্রশ্নেও সরকারের সমালোচনা রয়েছে। কট্টর ডানপন্থি মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোত্রিচের অবস্থানও রাজনৈতিক বিতর্ক বাড়িয়েছে।
গাজায় যুদ্ধ এবং পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ইসরায়েল সমালোচনার মুখে পড়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা নেতানিয়াহু সরকারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
নির্বাচনে লিকুদের আসন কমার আভাস
দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের নির্বাচনি ড্যাশবোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (২৮ অক্টোবর) বাংলাদেশ সময় সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে প্রকাশিত আংশিক ফলাফলে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২৯টি আসনে এগিয়ে ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের মোট ১২০টি আসনের মধ্যে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন।
এ কারণে লিকুদ এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও ডানপন্থি ও ধর্মীয় দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের মাধ্যমে নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করতে পারেন। ভোট গণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোনাথন রাইনহোল্ডের মতে, নেতানিয়াহু আবার প্রধানমন্ত্রী হলে দেশটির বিদ্যমান সমস্যাগুলো আরও গভীর হতে পারে বলে অনেক ইসরায়েলি আশঙ্কা করছেন। এ পরিস্থিতিতে কেউ কেউ ইসরায়েল ছেড়ে যাওয়ার কথাও ভাবছেন।
তবে অতীতেও রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছেন নেতানিয়াহু। ২০২১ সালে নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বে সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে তিনি ক্ষমতা হারান। এর আগে ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সরকার গঠন নিয়ে অচলাবস্থার কারণে ইসরায়েলে চারবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
এবারও দুর্নীতির বিচার, যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে সমালোচনা এবং সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত তার রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ বাড়িয়েছে।
ট্রাম্পের সমর্থন কি কাজে আসবে?
নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-এর এক জরিপে দেখা যায়, ৬৪ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, ট্রাম্পের সমর্থন তাদের ভোটের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে না। অন্যদিকে, ১৭ শতাংশ বলেছেন, এতে নেতানিয়াহুকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা কমেছে।
একই জরিপে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতানিয়াহুর চেয়ে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট এগিয়ে ছিলেন। আইজেনকোটের পক্ষে সমর্থন ছিল ৪৫ শতাংশ, আর নেতানিয়াহুর পক্ষে ৩৩ শতাংশ। জরিপে লিকুদ পার্টি ২১টি আসন এবং আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি ২৪টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছিল।
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উদি সোমারের মতে, নেতানিয়াহুর সমর্থন কমলেও বিরোধী দলগুলো জনঅসন্তোষকে কার্যকর রাজনৈতিক বিকল্পে রূপ দিতে পারেনি। বিশেষ করে ৭ অক্টোবরের হামলার আগে ও পরে সরকারের ব্যর্থতার জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিরোধীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
জোটের সমীকরণেই নির্ধারিত হতে পারে ভবিষ্যৎ
নির্বাচনপূর্ব জরিপগুলোতে কোনো দল বা জোটের এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হওয়ার আভাস পাওয়া যায়নি। ফলে নেতানিয়াহু ও আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে। মধ্যপন্থী জোট গঠন কিংবা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে আবার নির্বাচনের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে।
সব মিলিয়ে, নির্বাচনে লিকুদের আসন কমলেও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অধ্যায় এখনই শেষ হয়ে যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। শেষ পর্যন্ত জোট গঠনের সক্ষমতা, বিরোধী দলগুলোর অবস্থান এবং চূড়ান্ত ফলাফলই নির্ধারণ করবে তিনি ক্ষমতায় থাকবেন, নাকি দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নতুন এক অধ্যায়ের মুখোমুখি হবেন।
সূত্র: দ্য টাইমস অব ইসরায়েল।