কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেকে ‘টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে’ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছে জেলা প্রশাসন। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেল ৩টার দিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গ থেকে মরদেহগুলো হস্তান্তর করা হয়। এ সময় নিহতদের স্বজন, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান এবং সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান জানান, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

এর আগে সোমবার ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিহত ১০ জনের দেহাবশেষের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। তবে নিখোঁজ স্কুলশিক্ষক নাসরিন জাহান মুক্তার ডিএনএর সঙ্গে উদ্ধার হওয়া কোনো দেহাবশেষের নমুনার মিল পাওয়া যায়নি। এ কারণে তাঁর পরিণতি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

মুক্তার খোঁজে মঙ্গলবার সকালে রিসোর্টের ধ্বংসস্তূপে আবারও সমন্বিত উদ্ধার অভিযান চালানো হয়। পরে ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে একটি দেহাবশেষ উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। মুক্তার স্বামী দেওয়ান ফয়সাল গলায় থাকা স্বর্ণের চেইন দেখে সেটিকে তাঁর স্ত্রীর দেহাবশেষ বলে শনাক্ত করার দাবি করেছেন। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, ডিএনএ পরীক্ষা ও ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়ার পরই পরিচয় নিশ্চিত করা যাবে।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আকতার বলেন, ডিএনএ পরীক্ষায় ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত হলেও নিখোঁজ মুক্তার পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। এ কারণে তাঁকে খুঁজতে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষটি মুক্তার বলে ধারণা করা হচ্ছে। পুনরায় ডিএনএ পরীক্ষা ও ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার জানান, মঙ্গলবার সকালে পুলিশ, প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের সমন্বিত দল রিসোর্টের ধ্বংসাবশেষে তল্লাশি চালায়। এ সময় দোতলা থেকে দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়।

তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মামলার পলাতক ও অজ্ঞাতনামা আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ, সিআইডি ও এসআরবি কাজ করছে।

নিহতদের পরিচয়

অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের মধ্যে ঢাকার শ্যামলীর একটি পরিবারের চারজন রয়েছেন। তাঁরা হলেন গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাহিদুর রহমান (৪১), তাঁর স্ত্রী আফসানা মতিন (৩৬) এবং তাঁদের দুই মেয়ে রোজাইনা ইনায়া (৯) ও মুনাইনা ইহানা (৬)।

অন্য পরিবারের ছয় সদস্য হলেন মৌলিতা মেহজাবিন আলভি (১৯), তাঁর কাজিন লায়লা জাহান নাবিলা (২৫), ইসরাত জাহান মালিহা (২৭), ফারিয়া কবির (৩৩), ফারিয়ার ছয় বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ ফাইজান নূর এবং ফারিয়ার ভাই মোহাম্মদ নাফিস তেহামি (২৪)। তাঁরা ঢাকার বনশ্রী ও খিলগাঁও এলাকায় বসবাস করতেন।

নাফিস তেহামি ‘জেরিফ’ নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। মৌলিতা মেহজাবিন আলভি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে পপুলেশন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ সায়েন্সেস বিষয়ে পড়াশোনা করতেন। লায়লা জাহান নাবিলা ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী।

১০ দিন নিখোঁজ ছিলেন স্কুলশিক্ষক মুক্তা

নাসরিন জাহান মুক্তা সাভারের আশুলিয়ার স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। দুই বান্ধবীর সঙ্গে ছুটি কাটাতে তিনি কক্সবাজারে এসেছিলেন। তাঁর স্বামী দেওয়ান ফয়সাল ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সাবেক নেতা।

ফয়সালের দাবি, অগ্নিকাণ্ডের সময় তাঁর স্ত্রীসহ তিন বান্ধবী রিসোর্টে অবস্থান করছিলেন। আগুন লাগার আগে মুক্তার দুই বান্ধবী কক্ষ থেকে বের হয়ে গেলেও মুক্তা ভেতরে আটকা পড়েন। এরপর টানা ১০ দিন তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

ফয়সাল জানান, সোমবার পুলিশ ও প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেও তিনি স্পষ্ট তথ্য পাননি। পরে সন্ধ্যায় দুই স্বজনকে নিয়ে আবার ঘটনাস্থলে যান। মঙ্গলবার প্রশাসনের উদ্ধার অভিযানের সময় উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষের গলার স্বর্ণের চেইন দেখে তিনি সেটিকে স্ত্রীর বলে শনাক্ত করেন।

এর আগে তদন্ত কমিটির প্রধান ও কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান জানিয়েছিলেন, মুক্তার অবস্থান শনাক্ত করতে তাঁর মুঠোফোন নম্বরের তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। অগ্নিকাণ্ডের সময় তিনি রিসোর্টের ভেতরে ছিলেন, নাকি বাইরে ছিলেন, তা নিশ্চিত করতে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও তদন্তকারী দল কাজ করছিল।

২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা

আলোচিত এ ঘটনায় ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। মামলায় রিসোর্টের মালিক মোহাম্মদ তানভীর সুলতান মিয়াকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন। রিসোর্টের আরেক মালিক নেওয়াজ মোর্শেদও আত্মগোপনে রয়েছেন।