জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসনসংকট, দুর্নীতি, শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা ও রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ। ইউরোপ থেকে লাতিন আমেরিকা—নানা দাবিতে রাজপথে নেমেছেন হাজারো মানুষ। কোথাও আন্দোলন শান্তিপূর্ণ থাকলেও কোথাও তা রূপ নিয়েছে সহিংসতায়। সবচেয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ফ্রান্সে, যেখানে চলমান বিক্ষোভ ঘিরে প্রায় আড়াই হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রতিবেদনে ফ্রান্স, সার্বিয়া, তিউনিসিয়া, কলম্বিয়া ও ভেনেজুয়েলায় বিক্ষোভের খবর উঠে এসেছে। এ ছাড়া আগামী ৩১ অক্টোবর জার্মানিতে নতুন আন্দোলনের ডাক দিয়েছে তরুণদের একটি সংগঠন।
বিভিন্ন দেশে আন্দোলনের কারণ ভিন্ন হলেও নাগরিক অধিকার, অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি ও সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ এসব বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।
ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে ব্যাপক সহিংসতা
ফ্রান্সে চলমান আন্দোলনের সূত্রপাত গত ১৭ সেপ্টেম্বর। রাজধানী প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্বে ক্রেতেই শহরের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট ও জরাজীর্ণ ভবনের প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষকেরা। পরে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন শিক্ষার্থীরাও।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমস্যা নিয়ে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে। একপর্যায়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি সেবার মান ও সামাজিক অসন্তোষও আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ দাবিতে পরিণত হয়।
গত সপ্তাহান্তে বিক্ষোভের একাংশ সহিংস রূপ নেয়। বিভিন্ন শহরে দোকানপাটে লুটপাট, সরকারি ভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক টাউন হলেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহান্ত থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৫০০ জনকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৭৪ জনকে বিচারিক হেফাজতে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া ৯০০ জনের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম চলছে।
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে মাখোঁ
সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ফরাসি সরকার।
বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ জানান, অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিক্ষোভ করতে পারবে না। তবে স্বীকৃত সংগঠন ও ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে নির্দিষ্ট শর্তে বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হতে পারে।
নিরাপত্তার স্বার্থে অনুমোদিত বিক্ষোভের স্থান পরিবর্তন করার ক্ষমতাও কর্তৃপক্ষের হাতে থাকবে বলে জানান তিনি।
এরই মধ্যে লিওঁসহ কয়েকটি শহরে শনিবারের (২৪ অক্টোবর) নির্ধারিত বিক্ষোভের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
অন্যান্য দেশেও বাড়ছে আন্দোলনের উত্তাপ
ফ্রান্সের পাশাপাশি সার্বিয়ায় তরুণদের নেতৃত্বে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন নতুন রাজনৈতিক মাত্রা পেয়েছে। আন্দোলনকারীদের সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে সংসদ নির্বাচন।
অন্যদিকে ভেনেজুয়েলায় বিরোধী নেত্রীর দেশে প্রত্যাবর্তন ও অবাধ নির্বাচনের দাবিতে বিক্ষোভ হচ্ছে।
তিউনিসিয়ায় পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগকে কেন্দ্র করে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। কলম্বিয়ায় বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর পুলিশের হামলার অভিযোগও সামনে এসেছে।
এদিকে জার্মানিতে আগামী ৩১ অক্টোবর আন্দোলনের ডাক দিয়েছে তরুণদের একটি সংগঠন।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও বাড়িভাড়া, জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ এবং সামাজিক বৈষম্য নিয়ে জনমনে অসন্তোষ বাড়ছে।
বিভিন্ন দেশের এসব আন্দোলন একে অপরের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত না হলেও অর্থনৈতিক চাপ, সরকারি জবাবদিহি এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নগুলো আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে।