কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির সক্ষমতা ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে ওপেনএআইয়ের একটি পরীক্ষামূলক মডেল। প্রশিক্ষণমূলক কাজ সম্পন্ন করতে অনুমতি ছাড়াই একাধিক ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেট থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছে মডেলটি। চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি গত জুনে ঘটলেও বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) তা প্রকাশ্যে আনে ওপেনএআই।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেন্ডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনাটিতে জড়িত মডেলটির নাম জিপিটি-৫.৬ সল। ওপেনএআইয়ের অভ্যন্তরীণ গবেষণার জন্য তৈরি মডেলটিকে একটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত কাজ সম্পন্ন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
যেভাবে অর্থ সংগ্রহ করে এআই
প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে মডেলটিকে একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের অ্যাপ হালনাগাদ এবং ইথেরিয়ামের পরীক্ষামূলক নেটওয়ার্কে একটি স্মার্ট কন্ট্রাক্ট প্রকাশ করতে বলা হয়।
স্মার্ট কন্ট্রাক্ট হলো এমন একধরনের প্রোগ্রাম, যা পূর্বনির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়। তবে এটি প্রকাশ করতে নির্দিষ্ট পরিমাণ নেটওয়ার্ক ফি প্রয়োজন।
সমস্যা দেখা দেয় এখানেই। কাজটি সম্পন্ন করার জন্য মডেলটিকে কোনো অর্থ সরবরাহ করেনি ওপেনএআই।
এরপর মডেলটি নিজেই বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করে। একপর্যায়ে পরিচিত পুনরুদ্ধার বাক্যাংশ ব্যবহার করে পরিচালিত শত শত ক্রিপ্টো ওয়ালেটের ঠিকানা শনাক্ত করে এবং সেখান থেকে প্রয়োজনীয় টোকেন সংগ্রহ করে।
অর্থ নেওয়ার আগে নৈতিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে মডেল
ওপেনএআইয়ের প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অর্থ সংগ্রহের আগে মডেলটি নিজেই কাজটির নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল।
তবে পরবর্তী সময়ে এটি যুক্তি দাঁড় করায়, সংশ্লিষ্ট ওয়ালেটগুলো কার্যত পরিত্যক্ত। ফলে সেগুলোতে থাকা অর্থ ব্যবহার করা যেতে পারে।
অথচ মডেলটিকে দেওয়া নির্দেশনায় অন্য কোনো অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ সংগ্রহ কিংবা অনুমতি ছাড়া তা ব্যয়ের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি।
ওপেনএআই জানিয়েছে, ঘটনাটি দেখিয়েছে কীভাবে একটি স্বায়ত্তশাসিত এআই ব্যবস্থা অ্যাকাউন্টের মালিকের অনুমতির পরিবর্তে নিজের বিচার-বিশ্লেষণকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
বাস্তব অর্থ চুরি হয়নি, তবুও উদ্বেগ কেন?
ঘটনাটি ইথেরিয়ামের পরীক্ষামূলক নেটওয়ার্কে ঘটেছে। এই নেটওয়ার্ক মূল ইথেরিয়াম নেটওয়ার্ক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং এখানে ব্যবহৃত টোকেনের বাস্তব আর্থিক মূল্য নেই।
ফলে ঘটনাটিতে বাস্তব অর্থের ক্ষতি না হলেও অনুমতি ছাড়া অন্য ওয়ালেটের সম্পদ ব্যবহারের সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তাগত ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কাজ সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় টোকেন কোথা থেকে এবং কীভাবে সংগ্রহ করেছে, তা মডেলটি নিজ উদ্যোগে উন্নয়নকারীদের জানায়নি।
এ ঘটনার পর প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশ নেওয়া মডেলগুলোর সরাসরি ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করতে অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা চালুর কথা জানিয়েছে ওপেনএআই।
এআই নিরাপত্তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা
এ ঘটনা এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা চলছে।
সম্প্রতি শত শত বিজ্ঞানী উন্নত এআই প্রযুক্তির সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদ ব্যবহার তদারকির জন্য একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন।
এ সংক্রান্ত খোলা চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণার অন্যতম পথিকৃৎ জিওফ্রে হিন্টন, যিনি ‘এআইয়ের গডফাদার’ হিসেবে পরিচিত।
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও ব্যবহারপদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আরও গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় এখন বড় প্রশ্ন—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আরও বেশি স্বয়ংক্রিয় ক্ষমতা দেওয়ার পাশাপাশি মানুষের অনুমতি ও নিয়ন্ত্রণের সীমার মধ্যে কীভাবে রাখা সম্ভব?
সূত্র: ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডট ইউকে (প্রদত্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে)।