প্রবাসীদের সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন সেবা সহজ করতে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কার্ডটি বর্তমানে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। জর্ডান, দক্ষিণ কোরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশসহ বিভিন্ন স্থানে এর কার্যক্রম পরীক্ষামূলকভাবে চলছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বেসরকারি সংস্থা রামরুর ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী ‘সোনার মানুষ সম্মিলন ২০২৬’-এর প্রথম অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রবাসীরা দেশের সোনার মানুষ। তাদের সমস্যা সমাধান ও বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকার ১১টি খাত নির্ধারণ করেছে। এসব খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রবাসীদের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রবাসী কার্ডটি আর্থিক লেনদেনের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যাবে। এর মাধ্যমে প্রবাসীদের মৌলিক তথ্য সংরক্ষণ, বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসে সেবা গ্রহণ এবং দেশে ফিরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবায় বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া দেশে ফিরে জমিজমাসংক্রান্ত সমস্যায় পড়া প্রবাসীদের দ্রুত সেবা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে, বিশেষ করে সাত দিনের মধ্যে, প্রয়োজনীয় সেবা বা প্রতিকার দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রবাসীদের তিন প্রধান সমস্যা
প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের সমস্যার কথা তুলে ধরে নুরুল হক বলেন, তাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে তিনটি সাধারণ সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমত, দেশে পাসপোর্ট তৈরি করতে গিয়ে অনেককে দালালের সহায়তা নিতে হয়। পাসপোর্ট সেবায় দালালচক্র ও দুর্নীতি বন্ধ করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, বিদেশে কাজের উদ্দেশ্যে গিয়ে অনেক প্রবাসী প্রতিশ্রুত কাজ পান না। ঋণ করে বিদেশে যাওয়ার পর প্রত্যাশিত কাজ না পেয়ে তাদের দুর্ভোগে পড়তে হয়। তৃতীয়ত, বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতে সেবা নিতে গিয়ে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এ ছাড়া বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন সমস্যার কথাও প্রবাসীরা জানিয়েছেন।
রেমিট্যান্স ও ঋণসুবিধা বাড়ানোর পরিকল্পনা
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীদের উৎসাহিত করতে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে বর্তমানে ৩ শতাংশ প্রণোদনার ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংককে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ব্যাংকটিকে সাধারণ ব্যাংকিং কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রবাসী কার্ডের সঙ্গেও ব্যাংকটির সংযোগ রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
বর্তমানে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে তিন লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এই ঋণসুবিধার পরিধি বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রবাসীরা দেশে ফিরে ব্যবসা শুরু, নতুন উদ্যোগ গ্রহণ কিংবা বাড়ি নির্মাণের জন্য ঋণ নিতে চাইলে তাদের সহযোগিতা করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ঋণপ্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম ও অবৈধ প্রক্রিয়া বন্ধ করার ওপরও জোর দেন প্রতিমন্ত্রী।
অভিবাসন খাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা
তরুণদের প্রত্যাশিত নতুন বাংলাদেশ গঠনে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে নুরুল হক বলেন, গত পাঁচ দশকে দেশের উন্নয়নে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অভিবাসন খাতেও এসব প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা ও অর্জন ভবিষ্যতে দেশের উন্নয়ন এবং অভিবাসন ব্যবস্থার উন্নতিতে ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
উল্লেখ্য, জোরপূর্বক ও স্বেচ্ছামূলক অভিবাসন এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বাস্তুচ্যুতি নিয়ে কাজের ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘সোনার মানুষ সম্মিলন ২০২৬’ আয়োজন করেছে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)। গত তিন দশকে সংস্থাটি ১০০টির বেশি গবেষণা পরিচালনা, ১৩টি জাতীয় নীতি ও কৌশল প্রণয়নে অবদান এবং দেশের ২১ জেলায় অভিবাসীদের অধিকারভিত্তিক সেবা দিয়েছে।
সম্মেলনের উদ্দেশ্য হলো অভিবাসন বিষয়ে সংস্থাটির অভিজ্ঞতা তুলে ধরা, নতুন জ্ঞান বিনিময় এবং আগামী দিনের নীতিগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা। অনুষ্ঠানে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, গবেষক, সাংস্কৃতিক কর্মী, উন্নয়ন সংস্থা ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।