ভোরের আলো ফুটতেই বড় বাটি সামনে নিয়ে ময়দা মাখতে শুরু করেন নাসিম আল-ওদাইনি ও তার সহযোদ্ধা নারীরা। চুলায় আগুন জ্বেলে তৈরি করছেন খেজুরভরা পেস্ট্রি ও বিস্কুট। এসব খাবার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে ইয়েমেনের যুদ্ধের সম্মুখসারিতে থাকা যোদ্ধাদের কাছে। খাবারের সঙ্গে থাকছে একটি বার্তাও—‘নারীরা তোমাদের পাশে আছে।’

ইয়েমেনে দীর্ঘদিনের সংঘাতের মধ্যে সরকারি বাহিনীর যোদ্ধাদের সহায়তায় বহু বছর ধরে রান্নাঘরে খাবার প্রস্তুত করে আসছেন নারীরা। তাইজ প্রদেশে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় পুরোনো সেই উদ্যোগ আবারও শুরু করেছেন তারা।

মিডল ইস্ট আইকে নাসিম আল-ওদাইনি বলেন, ২০১৫ সালে তারা এই উদ্যোগ শুরু করেছিলেন। পরে লড়াই কমে যাওয়ায় চার বছরেরও বেশি সময় কার্যক্রম বন্ধ ছিল। তাইজে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার পর আবারও তা চালু করা হয়েছে।

নাসিমের মতে, যোদ্ধাদের মনোবল বাড়াতে খাবার, চিকিৎসাসামগ্রী ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া শহরের নারীদের দায়িত্বের অংশ। নিজের সঞ্চয়ের পাশাপাশি পরিচিতজন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনুসারীদের অনুদানে তিনি বিপুল পরিমাণ পেস্ট্রি ও বিস্কুট তৈরি করছেন।

তিনি বলেন, আগের তুলনায় এখন সহায়তার পরিধি অনেক বেড়েছে। তাইজের ভেতর ও বাইরের অনেক নারী এতে অংশ নিতে আগ্রহী হয়েছেন।

নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন তারা। অপরিচিত কোনো উৎস থেকে প্রস্তুত খাবার গ্রহণ না করে দাতাদের নির্ভরযোগ্য বিক্রেতার কাছ থেকে ময়দা, রান্নার তেলসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ কিনে রসিদ দেওয়ার অনুরোধ করা হচ্ছে।

সম্মুখসারিতেও যান নারীরা

অনেক নারী বিশ্বস্ত মাধ্যমের মাধ্যমে যোদ্ধাদের কাছে খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠালেও নাসিমের মতো কেউ কেউ নিজেরাই সম্মুখসারিতে গিয়ে সেগুলো পৌঁছে দেন।

নাসিম জানান, ২০১৫ সাল থেকে তিনি ও তার সহকর্মীরা নিজেরাই সম্মুখসারিতে গিয়ে খাবার পৌঁছে দিয়েছেন। এ কাজে তার তিন সহকর্মী নিহত হলেও তিনি সরবরাহ কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন।

মোমেন, ওসামা ও রেহাম নামে ওই তিনজন এই খাদ্য সহায়তা উদ্যোগের সক্রিয় সদস্য ছিলেন বলে জানান নাসিম। সম্মুখসারিতে সরবরাহ পৌঁছে দিতে গিয়ে তারা নিহত হন।

তার ভাষায়, সম্মুখসারিতে গিয়ে যখন যোদ্ধাদের প্রচণ্ড রোদ ও ঠান্ডার মধ্যে থাকতে দেখেন, তখন তাদের জন্য বিস্কুট ও সংরক্ষণযোগ্য খাবার তৈরি করাকে নিজের দায়িত্ব মনে হয়।

সম্প্রতি সম্মুখসারিতে খাবার পৌঁছে দেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে নাসিম বলেন, সেখানে পৌঁছানোর পর যোদ্ধারা আনন্দিত হয়েছিলেন। তারা তাকে জানিয়েছিলেন, বিস্কুটের চেয়ে নারীদের সেখানে উপস্থিতি তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এতে তারা মানসিক সমর্থন পান।

‘পুরো শহর তাদের পাশে’

নাসিমের মতো ইসরা আল-তাইয়েবও ২০১৫ সালে যোদ্ধাদের জন্য খাবার তৈরি শুরু করেছিলেন। ২০২২ সালে কার্যক্রমটি বন্ধ হয়ে গেলেও সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর আবার তা চালু করেছেন তিনি।

তাইয়েব জানান, বিভিন্ন জায়গা থেকে নারীরা তাদের সহায়তা করছেন। যোদ্ধাদের জন্য বিস্কুট, দুধ, পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠানো হচ্ছে। নগদ অনুদান সংগ্রহ, বাজার থেকে উপকরণ কেনা, খাবার তৈরি ও প্যাকেট করা এবং সম্মুখসারিতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আলাদা দল কাজ করছে।

যেসব নারী নিজেরা রান্না বা বেকিং করতে পারেন না, তারাও আর্থিক সহায়তা করছেন। অনুদানের অর্থে একটি ছোট রান্নাঘর থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

তাইয়েব বলেন, সম্মুখসারি থেকে পাওয়া প্রতিক্রিয়া তাদের কাজ চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিচ্ছে। যোদ্ধাদের কাছে এই বিস্কুট, দুধ ও পানি শুধু খাবার নয়—এগুলো তাদের মনে করিয়ে দেয় যে পুরো শহর তাদের পাশে রয়েছে।

খাবারে মানসিক শক্তিও

পশ্চিম তাইজ শহরের এক যোদ্ধা ছদ্মনাম ‘আহমেদ’ জানান, সম্মুখসারির ইউনিটগুলো এই সহায়তায় খুশি। সহজে বহন করা যায় এবং দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়—এমন খাবার যুদ্ধক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে এসব সহায়তা যোদ্ধাদের মানসিক শক্তিও জোগায়।

আহমেদের ভাষায়, সম্মুখসারিতে খাবারভর্তি গাড়ি পৌঁছালে তাদের মনে হয় পুরো প্রদেশ তাদের সঙ্গে রয়েছে। তারা একা নন।

মনোবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ হাইল আল-ফাকিহ মনে করেন, বাড়িতে তৈরি খাবারের আবেগগত গুরুত্ব অনেক বেশি। তার মতে, ঘরে তৈরি খাবার যোদ্ধাদের সঙ্গে তাদের পরিবার ও ঘরের একটি গভীর সংযোগ তৈরি করে এবং তাদের মানসিকভাবে উৎসাহিত করে।

ফাকিহের মতে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ইয়েমেনের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধের সময় যোদ্ধাদের জন্য নারীদের খাবার তৈরির এই চর্চা চলে আসছে। বর্তমান সংঘাতেও সেই ঐতিহ্য নতুন করে সামনে এসেছে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই