ফ্রন্টলাইন বাংলাদেশ | আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে হুতিদের সাম্প্রতিক সামরিক অগ্রগতিকে ‘ঐশ্বরিক বিজয়’ হিসেবে প্রশংসা করেছে ইরান। দেশটির সরকারি কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম হুতিদের একের পর এক সাফল্যকে স্বাগত জানালেও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালি বন্ধের কোনো ঘোষণা এখনো দেয়নি তেহরান।
চলতি সপ্তাহে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের কয়েকটি শহর ও দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয় হুতিরা। শুক্রবার গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা তাদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার দাবি করা হয়। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর ফলে ইয়েমেনের সরকার লোহিত সাগরে সরাসরি প্রবেশাধিকার হারিয়েছে।
হুতিদের এই অগ্রগতির ফলে বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছেও তাদের অবস্থান শক্ত হয়েছে। ইয়েমেনের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মায়ুন বা পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে যাওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে চাপ তৈরির সক্ষমতা বেড়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুতিদের পশ্চিম উপকূলের সাফল্যকে ‘ঐশ্বরিক বিজয়’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি এটিকে দীর্ঘদিনের দৃঢ়তা ও কঠিন যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াইয়ের ফল হিসেবে উল্লেখ করেন।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও হুতিদের সাফল্যের প্রশংসা করেছেন। তিনি সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ২০২৪ সালের একটি বক্তব্য পুনরায় প্রকাশ করে হুতিদের ‘প্রতিরোধ’ শেষ পর্যন্ত বিজয় বয়ে আনবে বলে মন্তব্য করেন।
ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ এবং সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবেরও হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তেহরানের কট্টরপন্থী গণমাধ্যমগুলোও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করছে।
বাব আল-মান্দাব নিয়ে হুতিদের অবস্থান
হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতিতে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত প্রণালিটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দেয়নি হুতিরা।
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি শুক্রবার বলেছেন, সৌদি আরবের জাহাজ ছাড়া অন্যান্য কোম্পানির জন্য সমুদ্রপথে চলাচল নিরাপদ। অর্থাৎ সৌদি জাহাজগুলোকে তারা এখনো তাদের অবরোধের আওতায় রাখছে।
উপকূল ও দ্বীপগুলোর নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় জাহাজ চলাচলের ওপর চাপ তৈরির সক্ষমতাও হুতিদের বেড়েছে। একটি ভিডিওতে হুতিদের এক কমান্ডারকে বলতে দেখা গেছে, জাহাজে হামলার ক্ষেত্রে শুধু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ওপর নির্ভর করতে হবে না; উপকূলে কামান স্থাপন করেও জাহাজ লক্ষ্য করা সম্ভব।
তবে ইরান এখনো হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতিকে সরাসরি বাব আল-মান্দাব বন্ধের কোনো পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করেনি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বরং বলেছে, হুতিরা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেয়। তেহরান হুতিদের ইরানের ‘প্রক্সি’ হিসেবে দেখার ধারণাও প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইয়ের ভাষ্য, ইয়েমেনে দীর্ঘদিনের অবরোধ ও সমস্যার সমাধান না হওয়ার কারণেই বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
ইরানের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
লোহিত সাগর উপকূল ও বাব আল-মান্দাবের কাছে হুতিদের সামরিক অবস্থান শক্তিশালী হওয়া ইরানের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে। এর পাশাপাশি আরব উপদ্বীপের অন্য প্রান্তে হরমুজ প্রণালিও ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান।
ফলে একদিকে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা, অন্যদিকে বাব আল-মান্দাবের কাছে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি—দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথেই অস্থিরতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে এ মুহূর্তে বাব আল-মান্দাব বন্ধের কোনো ঘোষণা দেয়নি তেহরান বা হুতিরা। বরং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান।
সূত্র: আল জাজিরা