হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজে হামলার বিরল ভিডিও ফুটেজ প্রথমবারের মতো প্রকাশ করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখা এবং অবৈধভাবে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে নিরাপদে পার করে দেওয়ার সক্ষমতার দাবি করার পর এর পাল্টা জবাব হিসেবে ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানি সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি।

শনিবার প্রকাশিত ওই ফুটেজে হরমুজ প্রণালিতে ইরানি নৌবাহিনীর নজরদারি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশনা না মানা কয়েকটি জাহাজে হামলার দৃশ্য দেখানো হয়েছে। আইআরজিসির দাবি, হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং অনুমতি ছাড়া চলাচলকারী জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ভিডিওর শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, মার্কিন যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং সেন্টকমের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের বক্তব্যের অংশ দেখানো হয়। সেখানে হরমুজ প্রণালি খোলা থাকা, এর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ এবং জাহাজ চলাচলের পথ নিরাপদ করার বিষয়ে মার্কিন পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরা হয়।

এরপরের অংশে ইরানি নৌবাহিনীকে কয়েকটি জাহাজের কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে নজরদারি করতে এবং নির্দেশনা না মানা জাহাজে হামলা চালাতে দেখা যায়।

ভিডিও প্রকাশের পর আইআরজিসি সতর্ক করে বলেছে, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র অবৈধভাবে চলাচলকারী জাহাজকে নিরাপদে পার করে দিতে পারবে—এমন দাবির ওপর নির্ভর না করতে।

আইআরজিসির ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক দেশগুলোর নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য হুমকি এবং মার্কিন সমর্থন ও এসকর্ট অভিযান নিয়ে করা দাবিকে তারা ‘মিথ্যা’ বলে মনে করে।

প্রথমবার হামলার ভিডিও প্রকাশ

যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের পক্ষ থেকে তেলবাহী জাহাজে হামলার ভিডিও প্রকাশের ঘটনাকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) নিয়মিতভাবে জাহাজে হামলার ভিডিও প্রকাশ করলেও আইআরজিসির পক্ষ থেকে এ ধরনের ফুটেজ প্রকাশের ঘটনা এবারই প্রথম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রুশ ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক এবং বিবিসির অতিথি আলোচক আরমান মাহমুদিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেছেন, ইরানি সংবাদমাধ্যম এবারই প্রথম তেলবাহী জাহাজে হামলার ভিডিও প্রকাশ করেছে।

তার দাবি, ভিডিওতে অন্তত দুটি জাহাজে হামলার দৃশ্য রয়েছে। এর মধ্যে একটি জাহাজকে সিএমএ সিজিএমের জাহাজ হিসেবে শনাক্ত করা যায় বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। তবে দ্বিতীয় জাহাজটি নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।

মাহমুদিয়ানের মতে, ভিডিওটির গুরুত্ব শুধু হামলার বিরল দৃশ্য ধারণের কারণে নয়; বরং ইরানি গণমাধ্যম হামলাগুলোকে সরাসরি প্রতিশোধমূলক অভিযান হিসেবে উপস্থাপন করেছে—এটিও উল্লেখযোগ্য।

এর আগে আইআরজিসি নৌবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি জাহাজ এবং অনুমতি ছাড়া চলাচলকারী তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার কথা জানিয়েছিল। ইরানের দাবি, দেশটির তেলবাহী জাহাজে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাব হিসেবেই এসব অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনা

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে নতুন করে হামলা শুরু করার পর তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে জুনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি সমঝোতার আওতায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রণালিটি পুনরায় খোলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সম্মত হয়েছিল বলে দাবি করা হয়।

সমঝোতা বাস্তবায়ন এবং নিরাপদ ও বৈধভাবে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরান পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ বা পিজিএসএ গঠনের উদ্যোগ নেয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কথিত লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে পরে আবারও প্রণালিটি বন্ধ করে দেয় তেহরান।

ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মার্কিন নৌ ও অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার, লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে হামলা বন্ধ এবং ইয়েমেনকে ঘিরে অবরোধের পরিস্থিতি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলবে না।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হওয়ায় সেখানে সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও সমুদ্রপথের বাণিজ্যে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সূত্র: প্রেস টিভি