আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে বিস্ফোরণে চারজন নিহত ও অন্তত ৬৮ জন আহত হওয়ার ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্রটি মার্কিন বাহিনীর হতে পারে বলে দাবি করেছেন কয়েকজন সামরিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞ। রয়টার্সের যাচাই করা ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে তারা বলেছেন, ঘটনাস্থলের ক্ষয়ক্ষতির ধরন কোনো স্থাপনায় হামলার পর ধ্বংসাবশেষ ছিটকে এসে ক্ষতি হওয়ার চেয়ে সরাসরি আঘাতের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

মঙ্গলবার ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের ছোট শহর কুহেস্তাকে এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। চার সামরিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণের মধ্যে তিনজন মনে করছেন, ঘটনাস্থলে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের পরিবর্তে মার্কিন অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনাই বেশি। তবে হামলার প্রকৃত কারণ ও ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।

এর আগে ১ সেপ্টেম্বর ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার ও যোগাযোগ স্থাপনা লক্ষ্য করে একাধিক হামলার কথা জানিয়েছিল মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড। দুই মার্কিন কর্মকর্তার দাবি, কুহেস্তাক এলাকার একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারও ওই হামলার লক্ষ্য ছিল।

স্যাটেলাইট তথ্য অনুযায়ী, ওই টেলিযোগাযোগ টাওয়ারটি বিয়ের অনুষ্ঠানস্থল থেকে প্রায় ১৩৫ মিটার দূরে। ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৯টার দিকে টাওয়ারটিতে আঘাত হানা হয়।

তবে রয়টার্সের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিয়ের অনুষ্ঠানস্থলের ভবনটির ক্ষয়ক্ষতির ধরন কাছের টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে হামলার ফলে ধ্বংসাবশেষ ছিটকে এসে ক্ষতি হওয়ার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

অস্ত্র বিশ্লেষক ট্রেভর বল বলেন, ভবনটির ছাদে বিস্ফোরণের চিহ্ন দেখে মনে হচ্ছে কোনো অস্ত্র সরাসরি ছাদে বা ছাদের ঠিক ওপর বিস্ফোরিত হয়েছে। তার মতে, কাছের যোগাযোগ টাওয়ারে হামলার ধ্বংসাবশেষ ছিটকে এসে এ ধরনের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা কম।

আরেক বিশেষজ্ঞ কলেটও মনে করেন, ঘটনাস্থলের প্রমাণ মার্কিন ৫০০ পাউন্ডের একটি আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্র ব্যবহারের দিকেই বেশি ইঙ্গিত করছে। অসলোভিত্তিক পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক সেবাস্টিয়ান শুটও বলেন, ছাদের ক্ষতির ধরন টেলিযোগাযোগ টাওয়ার থেকে ধ্বংসাবশেষ ছিটকে আসার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তিন বিশেষজ্ঞই বলেছেন, ভবনটি ভুল করে ছোড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধ্বংস হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম। ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু অস্ত্রের ধ্বংসাবশেষকে ট্রেভর বল মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত জেএসওডব্লিউ ধরনের গ্লাইড বোমার অংশ হিসেবে শনাক্ত করেছেন। তবে এসব ধ্বংসাবশেষ কুহেস্তাকের ওই ভবনে হামলার সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি রয়টার্স।

এদিকে বিয়ের অনুষ্ঠানে হতাহতের ঘটনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তদন্ত করছে বলে বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। মার্কিন সামরিক বাহিনীও জানিয়েছে, তারা ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মানবাধিকার পর্যবেক্ষণকারী দুই সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে বিয়ের অনুষ্ঠানের তিন অতিথি ছিলেন—৪৩ বছর বয়সী কলসুম মোল্লাহী নাজহানদানিয়া, ৫০ বছর বয়সী জারখাতুন তাহেরি এবং চার বছর বয়সী আমির মোহাম্মদ কারিমি। ১৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ মল্লাহী যোগাযোগ টাওয়ারের কাছে মোটরসাইকেলে থাকা অবস্থায় নিহত হন বলে জানিয়েছে সংগঠনগুলো।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, কাছের টেলিযোগাযোগ টাওয়ারটি কোনো সামরিক স্থাপনা নয়। এটি সিরিক কাউন্টির বাসিন্দাদের মোবাইল, টেলিফোন ও ইন্টারনেট সেবা দিয়ে থাকে।

ঘটনার পর ইরানে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৭৫ জনের বেশি শিশু ও শিক্ষক নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছিল ইরানি কর্তৃপক্ষ। ওই ঘটনার বিষয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের তদন্তের ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি।

বৃহস্পতিবার কুহেস্তাকে হামলায় নিহতদের স্মরণে জানাজা ও শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় এক প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য অনুযায়ী, এলাকায় শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে এবং মানুষ এখনো ঘটনাটি নিয়ে গভীরভাবে হতবাক।

হামলার ঘটনায় বেসামরিক হতাহতের দায় কার, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। মার্কিন কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি তদন্ত করছে বলে জানিয়েছে।


সূত্র: রয়টার্স