বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. আফজাল হোসেনের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) মো. নাসির উদ্দিনকে ঘিরে নিয়োগে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, রেলের জমি-সংক্রান্ত কাজে প্রভাব বিস্তার এবং সম্পদের উৎস নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের অধিকাংশেরই স্বাধীন ও চূড়ান্ত প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নথিভিত্তিক তদন্তের দাবি উঠেছে।

সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নাসির উদ্দিন রেলের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর আনুষ্ঠানিক দায়িত্বের বাইরে প্রভাব বিস্তার করেছেন। বিশেষ করে লেবার সর্দার নিয়োগ, সহকারী স্টেশন মাস্টার নিয়োগ এবং রেলের জমি লিজ ও উচ্ছেদ-সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এখনো হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন

প্রতিবেদনগুলোতে ২০২৩ সালে খুলনার সিঙ্গিয়া স্টেশনের গুডস ইয়ার্ডে একজনকে অস্থায়ী লেবার সর্দার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নাসির উদ্দিন ওই নিয়োগে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। সংশ্লিষ্ট নথি ও তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত এ অভিযোগকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

এ ছাড়া ২০১৬ সালে ২৫৭ জন সহকারী স্টেশন মাস্টার নিয়োগ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগের কথা প্রতিবেদনে এসেছে। এ ক্ষেত্রে নাসির উদ্দিনের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ রয়েছে কি না, তা নির্ধারণে ওই সময়কার নিয়োগসংক্রান্ত নথি ও অনুসন্ধানের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।

সম্পদ নিয়েও অভিযোগ

নাসির উদ্দিনের নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের উৎস নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। তাঁর গ্রামের বাড়িতে ব্যয়বহুল ভবন, বিভিন্ন স্থানে জমি-প্লট এবং ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার দাবি করা হয়েছে।

তবে সম্পদের অভিযোগ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, জমির দলিল, ব্যাংক লেনদেন এবং ব্যবসায়িক মালিকানার তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। এসব নথির স্বাধীন যাচাই ছাড়া অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত বলা যায় না।

‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে কাজ করার অভিযোগ

নাসির উদ্দিনকে রেলওয়ের ডিজি আফজাল হোসেনের কথিত অবৈধ অর্থ সংগ্রহের ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে কাজ করার অভিযোগও করা হয়েছে। একই সঙ্গে বড় কাজ নির্দিষ্ট ঠিকাদারি গোষ্ঠীকে পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

তবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে যে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে আর্থিক লেনদেন, সরকারি নথি, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

আফজাল হোসেনকে ঘিরে পদ্মা রেল প্রকল্পের অডিট আপত্তি

রেলওয়ের ডিজি মো. আফজাল হোসেনকে ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের সরকারি অডিট আপত্তি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকল্পটিতে ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠার কথা বলা হয়েছে।

অডিটে অতিরিক্ত মালামাল আমদানি, নির্ধারিত স্পেসিফিকেশনের চেয়ে কম মানের উপকরণ ব্যবহার, চুক্তির বাইরে ব্যয় বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত বিল পরিশোধসহ বিভিন্ন বিষয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে বলে প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে—অডিট আপত্তি থাকা মানেই দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়া নয়। প্রকল্প কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব আপত্তির বিষয়ে জবাব দেওয়া হচ্ছে এবং কিছু আপত্তি নিষ্পত্তিও হয়েছে। প্রকল্পের বর্তমান পরিচালক নাজনীন আরা কেয়া বলেছেন, অডিটে আপত্তি উঠলেই সেটিকে চূড়ান্তভাবে অনিয়ম বলা যায় না; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আপত্তিগুলোর জবাব দিচ্ছে।

আফজাল হোসেন এ বিষয়ে আগে গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, অডিটের অধিকাংশ আপত্তি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং বিস্তারিত তথ্যের জন্য প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে হবে।

তদন্তেই পরিষ্কার হতে পারে প্রকৃত চিত্র

নাসির উদ্দিনকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এবং আফজাল হোসেনের দায়িত্বকালীন বিভিন্ন প্রকল্পের অডিট আপত্তি—দুটি বিষয়ই এখন আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে অভিযোগের উৎসের পাশাপাশি সরকারি নথি, টেন্ডার ডকুমেন্ট, অফিস আদেশ, অডিট প্রতিবেদন, সম্পদ বিবরণী এবং আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করাকেই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে দেখা হয়।

ফলে রেলওয়ের পিএসকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ কিংবা ডিজিকে ঘিরে প্রকল্পের অডিট আপত্তি—কোনোটিকেই তদন্তের আগে চূড়ান্ত দুর্নীতি হিসেবে উল্লেখ করা সমীচীন নয়। একই সঙ্গে অভিযোগগুলো গুরুতর হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।