আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের অর্থনৈতিক সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি লেনদেনে মার্কিন ডলারের ভূমিকা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার ওপর জোর দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) ‘সরকার সপ্তাহ’ উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় তিনি এসব কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন, নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের মধ্যেও জনগণের প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা নিশ্চিত করতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রশংসা করেন তিনি।
প্রতি বছর সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলী রাজাই ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভাদ বাহোনারের স্মরণে ইরানে সরকার সপ্তাহ পালিত হয়। ১৯৮১ সালের ৩০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বোমা হামলায় তারা নিহত হন।
বার্তায় রাজাই, ইব্রাহিম রাইসি, বাহোনারসহ বিভিন্ন সরকারের নিহত কর্মকর্তা, ব্যবস্থাপক ও মন্ত্রীদের স্মরণ করেন খামেনি। পাশাপাশি সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলি খামেনির প্রতিও শ্রদ্ধা জানান তিনি।
সরকারের কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপকদের প্রচেষ্টার প্রশংসা করে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের আন্তরিক ও দায়িত্বশীল ভূমিকার কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন খামেনি।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নানা বিধিনিষেধ, ষড়যন্ত্র, নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের মধ্যেও যুদ্ধকালীন এবং পরবর্তী সময়ে জনগণের প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা নিশ্চিত করা, ক্ষতিগ্রস্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা মেরামত এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সরকারের পদক্ষেপ প্রশংসনীয়।
উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর
অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় করণীয় তুলে ধরে খামেনি মূল্যস্ফীতিসহ জীবনযাত্রার বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, অর্থনীতিতে মার্কিন ডলারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত ‘প্রতিরোধী অর্থনীতি’র নীতিগুলোকে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে হবে।
খামেনির মতে, এসব সমস্যা সমাধানের মূল চাবিকাঠি হলো যতটা সম্ভব দেশীয় উৎপাদনের ওপর নির্ভর করা। যেখানে পর্যাপ্ত অভ্যন্তরীণ উৎপাদন নেই, সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী বিচক্ষণতার সঙ্গে আমদানি করতে হবে।
নতুন মার্কিন চাপের মধ্যেই বার্তা
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেই খামেনির এই বার্তা এলো। এর আগে সোমবার ওয়াশিংটন ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে নতুন অর্থনৈতিক অভিযান শুরু করে।
খামেনি বলেন, যুদ্ধের সময় এবং পরবর্তী সময়ে শত্রুপক্ষের কর্মকাণ্ড দেশের ওপর প্রভাব ফেললেও অর্থনীতির বিভিন্ন উপাদান আরও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা, জনগণ ও বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা এবং নতুন সক্ষমতাগুলো কাজে লাগানোর মাধ্যমে উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথ তৈরি করা সম্ভব।
তিনি অভিযোগ করেন, ইরানের শত্রুরা জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথ তাদের অনুসরণ করা এবং তাদের দাবি মেনে নেওয়ার মধ্যেই রয়েছে। তবে ইসলামি বিপ্লবের আগেও ইরান ও দেশটির সম্পদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ পর্যবেক্ষণ করলে এর বিপরীত চিত্র পাওয়া যায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রযুক্তি ও জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্ব
তরুণ মেধাবীদের উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দেন খামেনি। সময়মতো নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন কাজে লাগানোর পাশাপাশি প্রচলিত পদ্ধতি ও দীর্ঘদিনের অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, জনগণের মনোবল ও জাতীয় উদ্দীপনা দুর্বল করে এমন হতাশাজনক বক্তব্য এবং কল্পিত বিভাজন ইরানের জনগণের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতি করেছে। ভবিষ্যতেও এসবের একই ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সামাজিক সংহতি ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়ে জাতীয় ঐক্য রক্ষার ওপর জোর দেন খামেনি। সরকারের সব কৌশল ও নীতিতে সংস্কৃতি, শিক্ষা ও নৈতিক বিকাশকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
এ ছাড়া শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, নার্স ও চিকিৎসকদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা। সন্তানদের লালন-পালনের মাধ্যমে দেশের সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ গঠনে গৃহিণীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
সূত্র: প্রেস টিভি