নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয় সংসদে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কনসার্ট ও নৌকাবাইচ বন্ধ হওয়া এবং জেলার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকেলে জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে সম্পূরক প্রশ্ন করার সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তোলেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। একই সঙ্গে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

হাসনাতের বক্তব্যের প্রতিবাদে শুক্রবার (২৮ আগস্ট) রাতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ। মিছিল থেকে হাসনাত আবদুল্লাহকে তার বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এনসিপির কোনো কর্মসূচি হতে দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

সংসদে যা বলেছিলেন হাসনাত

জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে সম্পূরক প্রশ্ন করেন হাসনাত আবদুল্লাহ।

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রতি মাসে গড়ে ২৬০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। বর্তমান সরকারের সময়ে এ সংখ্যা বেড়ে ৩১১টিতে দাঁড়িয়েছে।

তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ছয় মাসে ১ হাজার ৭৮০ জন এবং বর্তমান সরকারের ছয় মাসে ১ হাজার ৭৮৯ জন খুন হয়েছেন। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও বেড়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

হাসনাতের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের ছয় মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল ১ হাজার ৯০টি। বর্তমান সরকারের সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ১৬৫টিতে। একই সময়ে গণপিটুনিতে নিহত ও পুলিশের ওপর হামলার পরিসংখ্যানও তুলে ধরেন তিনি।

এরপর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রসঙ্গ তুলে হাসনাত বলেন, জেলায় কনসার্ট ও নৌকাবাইচ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে ‘কালচারাল জেলা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন জানিয়ে তিনি সেখানে গান-বাজনা ও সিনেমা বন্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন।

সবশেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, গত ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও পুনরুদ্ধারে তিনি কতটা ভূমিকা রাখতে পেরেছেন এবং এ ক্ষেত্রে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন কি না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পাল্টা জবাব

হাসনাত আবদুল্লাহর প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এটা প্রশ্ন, না পল্টনের বক্তৃতা—বুঝতে পারিনি।’

তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি সফল হয়েছেন কি না—এটি একটি প্রশ্ন। আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সিনেমা হল কেন নেই—সেটি ভিন্ন প্রশ্ন।

হাসনাতের দেওয়া হত্যা ও আহতের পরিসংখ্যান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, এসব তথ্য কীসের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে এবং কোন পরিসংখ্যান থেকে নেওয়া হয়েছে, তা তিনি জানেন না।

সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেন, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে এবং সেই উন্নতি দৃশ্যমান। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে তা সংসদে উত্থাপন করা হলে ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দেওয়ার কথাও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

হাসনাতের বক্তব্যের প্রতিবাদে বিক্ষোভ

সংসদে দেওয়া বক্তব্যের প্রতিবাদে শুক্রবার রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিক্ষোভ মিছিল করে কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ। রাত পৌনে ১২টার দিকে শহরের জামিয়া ইউনিসিয়া মাদরাসা থেকে মিছিলটি বের হয়। পরে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে বিক্ষোভকারীরা সমাবেশ করেন।

সমাবেশে বক্তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে সংসদে হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যের সমালোচনা করেন। এ সময় তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয় এবং বক্তব্যের জন্য তাকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

বক্তারা ঘোষণা দেন, হাসনাত আবদুল্লাহ ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এনসিপির কোনো কর্মসূচি হতে দেওয়া হবে না।

শনিবার (২৯ আগস্ট) ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এনসিপির সাংগঠনিক কর্মসূচি রয়েছে। এর আগে হাসনাতের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ এবং কর্মসূচি প্রতিহতের ঘোষণায় জেলার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত এনসিপির কোনো নেতার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। হাসনাত আবদুল্লাহরও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বলেন, হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যের প্রতিবাদে মাদরাসা শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করেছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল। তবে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

তিনি আরও জানান, শনিবারের এনসিপির কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুলিশের গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।