আন্তর্জাতিক ডেস্ক

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—এত অল্প সময়ে এত ভয়াবহ বন্যার সূত্রপাত হলো কীভাবে?

কয়েক মিনিটের ব্যবধানে তীব্র স্রোতে ভেসে গেছে পাহাড়ি জনপদ, ঘরবাড়ি, সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। প্রাণ হারিয়েছেন বহু মানুষ। শুরুতে তিব্বতে আঘাত হানা ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে সন্দেহ করা হলেও নেপাল বা চীন—কোনো পক্ষই এখনো ভূমিকম্পের সঙ্গে বন্যার সরাসরি যোগসূত্র নিশ্চিত করতে পারেনি।

বিজ্ঞানীরা হিমবাহে পাথর ও বরফধস, হিমবাহ হ্রদের পানি আকস্মিকভাবে বেরিয়ে আসা কিংবা অতিবৃষ্টিসহ বিভিন্ন সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন। তবে দুর্গম সীমান্ত এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে।

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বুধবার (২৬ আগস্ট) পার্লামেন্টে জানান, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ভূমিকম্প আঘাত হানে। মাত্র তিন মিনিট পর সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে আকস্মিক বন্যার খবর পাওয়া যায়। তবে দুই ঘটনার মধ্যে কোনো বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো যাচাই করা প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, তিব্বতের ভূখণ্ডে ওই সময় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। এর কেন্দ্র ছিল গোসাইকুণ্ডা থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে।

তবে নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (এনডিআরআরএমএ) প্রাথমিক বিশ্লেষণে ভিন্ন সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি জানিয়েছে, নেপাল-চীন সীমান্তের প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে রসুওয়াগাধি সীমান্ত পয়েন্টের কাছে একটি হিমবাহে পাথরধসের পর ধ্বংসাবশেষসহ বন্যার পানি লহেন্দে নদীতে ঢুকে পড়ে। পরে তা তিমুরে হয়ে ত্রিশূলী নদীতে প্রবাহিত হয়।

লাসায় নিযুক্ত নেপালের কনসাল জেনারেল লক্ষ্মী প্রসাদ নিরাউলা বলেন, বন্যার কারণ নিয়ে কিছু বিচ্ছিন্ন তথ্য পাওয়া গেলেও চীনা কর্তৃপক্ষও এখনো এর উৎস নিশ্চিত করতে পারেনি। হিমবাহ থেকে আকস্মিকভাবে পানি বেরিয়ে আসা কিংবা অতিবৃষ্টির কারণে বন্যা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তিনি জানান, মঙ্গলবার মানস সরোবর ও আলি এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছিল। সেই বৃষ্টিও আকস্মিক বন্যার সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। বিষয়টি চীনা কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছে।

যোগাযোগব্যবস্থা, সড়ক নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো থেকেও পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বন্যার প্রকৃত মাত্রা ও উৎস নির্ধারণে দুই দেশের কর্তৃপক্ষই সমস্যায় পড়েছে।

এদিকে নতুন এই দুর্যোগ নেপালে ‘গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’ বা জিএলওএফের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত বছরের জুলাইয়েও চীনের উচ্চ পার্বত্য এলাকায় একটি হিমবাহ হ্রদ ভেঙে আকস্মিক বন্যা হয়েছিল। সেই পানির ঢলে সীমান্তবর্তী এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং অন্তত ১১ জন নিহত হন। রসুওয়াগাধির মিতেরি বা ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজও ভেসে যায়।

ওই ঘটনার পর নেপাল ও চীন সীমান্তবর্তী বন্যা ও ভূমিধসের বিষয়ে তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদান এবং হিমবাহ হ্রদ ভেঙে পড়ার আগাম সতর্কতার বিষয়ে একমত হয়েছিল। তবে এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি।

সাম্প্রতিক বন্যার পর ভোতেকোশি, ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের সতর্ক করেছে নেপাল সরকার। আরও বন্যার আশঙ্কায় নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সহায়তার হাত বাড়িয়েছে ভারত-চীন-যুক্তরাষ্ট্র

ভয়াবহ বন্যার পর উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্গঠনে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে প্রতিবেশী ভারত ও চীন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বব্যাংকও সহায়তার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতিতে শোক জানিয়ে নেপালের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। ভারত জরুরি ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্র অনুযায়ী, ভারতীয় বিমানবাহিনীর সি-১৭ ও সি-১৩০ উড়োজাহাজে ত্রাণসামগ্রী, ওষুধ ও মাটি কাটার যন্ত্রপাতি পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশেষ দলও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

চীনও প্রয়োজন অনুযায়ী সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে সহায়তার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

বিশ্বব্যাংকও জরুরি সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের নেপালবিষয়ক কান্ট্রি ডিরেক্টর ডেভিড সিসলেন জানিয়েছেন, বিভিন্ন উৎস থেকে জরুরি সহায়তা হিসেবে সর্বোচ্চ ২৫ বিলিয়ন নেপালি রুপি সংগ্রহ করা যেতে পারে। তবে এই অর্থ ঋণ, অনুদান নাকি অন্য কোনো অর্থায়ন ব্যবস্থায় দেওয়া হবে, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি।

ভয়াবহ এই দুর্যোগে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের বিস্তীর্ণ এলাকায় ঘরবাড়ি, সড়ক ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন নেপালি রুপি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে দুর্যোগের প্রকৃত কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে আরও তদন্ত ও তথ্য সংগ্রহের অপেক্ষায় রয়েছে নেপাল সরকার।