ফ্রন্টলাইন বাংলাদেশের বিশেষ প্রতিবেদনঃ
রক্ষকই যখন ভক্ষক প্রবাদ আছে, কিন্তু বাংলাদেশ রেলওয়েতে ভক্ষক আফজাল হোসেনকে দেওয়া হয়েছে রেলের ডিজি হিসেবে রক্ষকের দ্বায়িতে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য, অনিয়ম ও অর্থপাচারের অভিযোগ এনে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত আবেদন দিয়েছেন রেলওয়ের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রমজান আলী।
গত ৫ এপ্রিল জমা দেওয়া ওই অভিযোগপত্রে আফজাল হোসেনকে “দুর্নীতির সিন্ডিকেটের প্রধান”, “ঘুষখোর” এবং সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের “পোষ্যপুত্র” বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, পদ্মা সেতু রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প এবং খুলনা-মোংলা রেললাইন প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আফজাল হোসেন ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম করেছেন।
একই সঙ্গে রেলওয়ের শীর্ষ পদে নিয়োগ পেতেও তিনি ঘুষ দিয়েছেন বলে অভিযোগে দাবি করা হয়।
রমজান আলী অভিযোগ করেন, “রেলওয়েকে একটি দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করা হয়েছে”, যেখানে ঠিকাদার, আমলা ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী চক্র কাজ করেছে।
পদ্মা সেতু রেল প্রকল্পে ‘সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম: অভিযোগপত্রে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে পদ্মা সেতু রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প ঘিরে।
সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর দাবি, প্রকল্পের মূল চুক্তিপত্রের বিভিন্ন কাজ বাতিল করে সম্পূরক চুক্তির মাধ্যমে ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়। এতে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, রেললাইনের এমব্যাংকমেন্ট নির্মাণে নির্ধারিত পাথরের পরিবর্তে কম খরচের ইটের খোয়া ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়। অভিযোগে বলা হয়, এতে ঠিকাদারদের শত শত কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয় এবং বিনিময়ে মোটা অঙ্কের ঘুষ নেওয়া হয়।
রমজান আলীর দাবি, এই প্রকল্পে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকার অডিট আপত্তিও রয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ঠিকাদারদের কাছ থেকে নেওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে এবং এর একটি অংশ অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানো হয়েছে, যেখানে আফজাল হোসেনের সন্তানরা বসবাস করেন।
খুলনা-মোংলা রেললাইন প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ: খুলনা-মোংলা পোর্ট রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে নিয়মিত ঘুষ গ্রহণের বিনিময়ে নিম্নমানের কাজ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। রূপসা সেতু প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমেও অনিয়ম করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
‘১০ কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে ডিজি পদ’
রমজান আলীর অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়, রেলওয়ের মহাপরিচালক পদে নিয়োগ পেতে আফজাল হোসেন প্রায় ১০ কোটি টাকা ঘুষ দিয়েছেন।
তিনি অভিযোগ করেন, মেধা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে অন্য কর্মকর্তারা এগিয়ে থাকলেও প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে আফজাল হোসেন গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো পেয়েছেন।
অভিযোগে বলা হয়, “দুদকের ছাড়পত্র ছাড়াই” তাকে মহাপরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা সরকারি বিধিবিধানের পরিপন্থী।
‘দুর্নীতির সিন্ডিকেট’ পরিচালনার অভিযোগ
অভিযোগপত্রে রেলওয়ের অভ্যন্তরে একটি প্রভাবশালী দুর্নীতির চক্রের কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
রমজান আলীর ভাষ্য, গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প, টেন্ডার ও সরবরাহ কাজ নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের দেওয়া হতো এবং বিনিময়ে কমিশন আদায় করা হতো।
তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন প্রকল্পে ঠিকাদারদের কাছ থেকে চুক্তিমূল্যের ১০ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও নিম্নমানের কাজ করে পুরো বিল তুলে নেওয়ারও অভিযোগ আনা হয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয় বদলের অভিযোগ
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আফজাল হোসেন সরকার পরিবর্তনের পর দ্রুত রাজনৈতিক অবস্থান বদলে বিএনপিপন্থী পরিচয়ে সক্রিয় হন।
রমজান আলীর অভিযোগ, “ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের অবস্থান বদলে প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন” আফজাল হোসেন।
তদন্ত ও সম্পদ জব্দের দাবি
দুদকের কাছে দেওয়া আবেদনে আফজাল হোসেন ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের অনুসন্ধান, ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার দাবি জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়ে অভিযোগকারী বলেন, “রেলওয়েকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।
রেলসংশ্লিষ্টদের অভিমত, বাংলাদেশ রেলওয়াকে অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণ থেকে রক্ষা করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপে রেলপথ মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ের প্রশাসনিক কাঠামোতে জরুরি ও ব্যাপক সংস্কার এখন সময়ের দাবি। রেলকে সুরক্ষিত রাখতে এর চেয়ে কার্যকর বিকল্প আর নেই।
এই অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে বা আফজাল হোসেনের
আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগপত্রে উত্থাপিত দাবিগুলোর বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত ও প্রমাণ উপস্থাপনই চূড়ান্তভাবে বিষয়টির সত্যতা নির্ধারণ করবে।